Favicon

দীর্ঘ ৭ বছর পর প্রিমিয়াম স্মার্টফোন নিয়ে বাংলাদেশের বাজারে হুয়াওয়ে

প্রতিবেদক: মাজহারুল ইসলাম মিচেল জুন ৭, ২০২৬, ৬:২৩ অপরাহ্ণ বিভাগ: জাতীয়
দীর্ঘ ৭ বছর পর প্রিমিয়াম স্মার্টফোন নিয়ে বাংলাদেশের বাজারে হুয়াওয়ে
এআই দিয়ে তৈরিকৃত ছবি।
নিজেদের হারিয়ে যাওয়া অবস্থান পুনর্দখল করতে চায় হুয়াওয়ে

দীর্ঘ সাত বছরের বিরতি কাটিয়ে অবশেষে বাংলাদেশের প্রিমিয়াম স্মার্টফোন বাজারে আনুষ্ঠানিকভাবে কামব্যাক করতে যাচ্ছে বৈশ্বিক প্রযুক্তি জায়ান্ট হুয়াওয়ে। আগামী ৮ জুন প্রতিষ্ঠানটি তাদের সর্বশেষ ফ্ল্যাগশিপ ডিভাইসগুলো দেশের বাজারে উন্মোচন করবে।

উচ্চমানের (হাই-এন্ড) স্মার্টফোনের ক্রমবর্ধমান চাহিদার এই সময়ে হুয়াওয়ের এই প্রত্যাবর্তন দেশের প্রিমিয়াম মোবাইল বাজারে একটি বড় পরিবর্তন নিয়ে আসবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। হুয়াওয়ে বাংলাদেশ অফিস দ্য শাটল টাইমস-কে নিশ্চিত করেছে যে, তারা অফিশিয়াল ওয়ারেন্টি এবং আসল পার্টসের নিশ্চয়তাসহ ফ্ল্যাগশিপ স্মার্টফোন, ট্যাবলেট, অডিও প্রোডাক্ট এবং পরিধানযোগ্য (ওয়্যারেবল) ডিভাইস দেশের বাজারে নিয়ে আসছে। এর মাধ্যমে তারা দেশের প্রিমিয়াম স্মার্ট ডিভাইসের বাজারে নিজেদের হারিয়ে যাওয়া অবস্থান পুনর্দখল করতে চায়।

যেভাবে মিলবে হুয়াওয়ের ডিভাইস (বিতরণ কৌশল)

হুয়াওয়ে তাদের পণ্যগুলো স্থানীয় পরিবেশক ডিএক্স গ্রুপ (DX Group)-এর মাধ্যমে বাজারজাত করবে। প্রাথমিক ধাপে ঢাকার বড় বড় রিটেল আউটলেট এবং শীর্ষস্থানীয় ই-কমার্স প্ল্যাটফর্ম যেমন—দারাজ (Daraz) ও পিকাবু (Pickaboo)-কে কেন্দ্র করে এই বিক্রি শুরু হবে। পরবর্তীতে ঢাকার বাইরে অন্যান্য প্রধান বিভাগীয় শহরগুলোতেও এই কার্যক্রম প্রসারিত করা হবে।

হুয়াওয়ে বাংলাদেশের মার্কেটিং ম্যানেজার ফারুক রহমান জানান, তাদের শুরুর দিকের পণ্য তালিকায় থাকছে ফ্ল্যাগশিপ ফোন Huawei Mate 80 Pro, আল্ট্রা-প্রিমিয়াম ফোল্ডেবল ফোন Huawei Mate X7 এবং তরুণদের জন্য লাইফস্টাইল-ফোকাসড Huawei Nova 15 Max। স্মার্টফোনের পাশাপাশি MatePad 11.5 ট্যাবলেট, Watch Fit 5 সিরিজ, FreeBuds ওয়্যারলেস ইয়ারবাডস এবং FreeClip ওপেন-ইয়ার অডিও ডিভাইস বাজারে পাওয়া যাবে। ফারুক রহমানের মতে, হুয়াওয়ে মূলত বাংলাদেশের প্রিমিয়াম এবং আপার-মিড-রেঞ্জ স্মার্টফোন ব্যবহারকারীদের লক্ষ্য করেই মাঠে নামছে।

ডিএক্স গ্রুপের লিড মার্কেটার মো. জান্নাতুল নাঈম বলেন, "আমাদের প্রথম লক্ষ্য হলো দেশব্যাপী ক্রেতাদের কাছে পৌঁছানো। তবে শুরুতে আমরা গ্যাজেট অ্যান্ড গিয়ার, সুমাশ টেক, দারাজ এবং পিকাবুর মতো প্রধান রিটেল ও অনলাইন পার্টনারদের ওপর ফোকাস করছি।" ইতোমধ্যে বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (বিটিআরসি)-সহ সব ধরনের নিয়ন্ত্রক সংস্থার প্রয়োজনীয় অনুমতি সম্পন্ন করেছে হুয়াওয়ে।

কেন বাংলাদেশ ছাড়তে হয়েছিল হুয়াওয়েকে?

২০১৯ সালে মার্কিন সরকারের 'এনটিটি লিস্ট' বা কালো তালিকাভুক্ত হওয়ার পর হুয়াওয়ের ওপর বৈশ্বিক নিষেধাজ্ঞা নেমে আসে। এই নিষেধাজ্ঞার কারণে গুগল তাদের নতুন হ্যান্ডসেটগুলোতে গুগল মোবাইল সার্ভিসেস (GMS) সমর্থন বন্ধ করে দিতে বাধ্য হয়। ফলে ব্যবহারকারীরা প্লে-স্টোর, জিমেইল বা ইউটিউবের মতো অতি প্রয়োজনীয় অ্যাপগুলো সরাসরি ব্যবহারের সুবিধা থেকে বঞ্চিত হন।

যেহেতু বাংলাদেশের মতো আন্তর্জাতিক বাজারগুলোতে গ্রাহকরা গুগলের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল, তাই গুগল অ্যাপস না থাকাটা হুয়াওয়ের জন্য বড় ধরনের ধাক্কা ছিল। প্রতিযোগিতা টিকিয়ে রাখতে না পেরে হুয়াওয়ে তাদের স্মার্টফোন ব্যবসা সংকুচিত করে ফেলে এবং ২০২১ সালের পর বাংলাদেশের বাজারে তাদের ফোনের অফিশিয়াল কার্যক্রম পুরোপুরি স্থবির হয়ে পড়ে। তবে স্মার্টফোন ব্যবসা বন্ধ থাকলেও গত কয়েক বছর ধরে বাংলাদেশের টেলিকম অবকাঠামো, ক্লাউড সিস্টেম ও ডেটা সেন্টারের মতো ব্যাক-এন্ড প্রযুক্তিতে হুয়াওয়ে শক্তিশালী উপস্থিতি বজায় রেখেছিল।

গুগলের বিকল্প: অ্যাপ ইকোসিস্টেমের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা

এবার হুয়াওয়ে ফিরছে সম্পূর্ণ নিজস্ব এবং শক্তিশালী ইকোসিস্টেম 'অ্যাপগ্যালারি' (AppGallery)এইচএমএস (HMS) নিয়ে। ফারুক রহমান জানান, "আমাদের অ্যাপগ্যালারিতে এখন হোয়াটসঅ্যাপ, বিভিন্ন মেসেজিং ও ইমেইল সার্ভিসসহ প্রায় সব ধরনের দরকারি অ্যাপের সুবিধা রয়েছে। এছাড়া গুগল প্লে-স্টোরের বিকল্প হিসেবে অ্যাপ ডাউনলোডের জন্য আমাদের নিজস্ব ব্রাউজার ও অল্টারনেটিভ সল্যুশন তৈরি করা হয়েছে।"

তিনি দাবি করেন, গুগলের ট্র্যাডিশনাল ইকোসিস্টেমের ওপর নির্ভর না করেই হুয়াওয়ের নতুন ডিভাইসগুলো গ্রাহকদের একদম স্মুথ ও নিরবচ্ছিন্ন অভিজ্ঞতা দেবে। তবে যেসব লোকাল অ্যাপ এখনো অ্যাপগ্যালারিতে যুক্ত হয়নি, সেগুলো থার্ড-পার্টি অল্টারনেটিভ অ্যাপ স্টোর থেকে ডাউনলোড করে নেওয়া যাবে।

বাংলাদেশে কারখানা স্থাপনের পরিকল্পনা

শুধু আমদানির মধ্যেই সীমাবদ্ধ না থেকে হুয়াওয়ে বাংলাদেশে দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা নিয়ে এগোচ্ছে। অফিশিয়াল রিটেল নেটওয়ার্কের মাধ্যমে ব্র্যান্ডের অবস্থান তৈরি করার পর, পরবর্তী ধাপে হুয়াওয়ে বাংলাদেশেই ডিভাইস অ্যাসেম্বলিং বা উৎপাদন কারখানা স্থাপনের কথা ভাবছে।

স্থানীয়ভাবে ডিভাইস তৈরি করা গেলে একদিকে যেমন আমদানি নির্ভরতা ও উৎপাদন খরচ কমবে, অন্যদিকে সরকারের নিজস্ব ইলেকট্রনিক্স ম্যানুফ্যাকচারিং ইকোসিস্টেম তৈরির উদ্যোগও গতি পাবে। ফলে দেশের বাজারে আরও কম দামে প্রিমিয়াম ডিভাইস সরবরাহ করে প্রতিযোগিতায় এগিয়ে যেতে পারবে হুয়াওয়ে।

গ্রাহকদের মন কি জয় করতে পারবে হুয়াওয়ে?

সাত বছর পর হুয়াওয়ের এই প্রত্যাবর্তন কতটা সফল হবে, তা কেবল হাইপের ওপর নয়, বরং ব্যবহারকারীদের বাস্তব অভিজ্ঞতার ওপর নির্ভর করবে। দেশের বাজারে হুয়াওয়ের পুরনো সুনাম ও ব্র্যান্ড ভ্যালু এখনও রয়েছে, তবে বর্তমান বাজার আগের চেয়ে অনেক বেশি প্রতিযোগিতাপূর্ণ। ব্যবহারকারীরা এখন পুরোপুরি গুগলের সেবায় অভ্যস্ত।

হুয়াওয়ে যদি তাদের অ্যাপগ্যালারিকে সহজ ও নির্ভরযোগ্য করতে পারে এবং সঠিক মূল্যে দুর্দান্ত হার্ডওয়্যার দিতে পারে, তবে ধীরে ধীরে প্রিমিয়াম ক্রেতাদের আস্থা ফিরে পাওয়া সম্ভব। তবে হারিয়ে যাওয়া রাজত্ব এক রাতে ফিরে আসবে না; এর জন্য প্রয়োজন হবে ধারাবাহিকতা, চমৎকার লোকাল কাস্টমার সাপোর্ট এবং এমন প্রোডাক্ট—যা মানুষের দৈনন্দিন জীবনকে সহজ করে তুলবে।

হুয়াওয়ের বাংলাদেশে ফেরার খবরের প্রধান তথ্যগুলো নিয়ে একটি সহজ ও গোছানো বাংলা তথ্যসারণী (Table) দেওয়া হলো:

বিষয়ের ক্যাটাগরি মূল তথ্য ও আকর্ষণীয় দিকসমূহ
মূল খবর দীর্ঘ ৭ বছরের বিরতি কাটিয়ে বাংলাদেশের প্রিমিয়াম স্মার্টফোন বাজারে অফিশিয়ালি কামব্যাক করছে হুয়াওয়ে। বিটিআরসি (BTRC)-সহ সব ধরনের সরকারি অনুমোদন ইতোমধ্যে সম্পন্ন হয়েছে।
উদ্বোধনের তারিখ ৮ জুন, ২০২৬
বাজার ছাড়ার কারণ ২০১৯ সালের মার্কিন নিষেধাজ্ঞার পর গুগল হুয়াওয়ের সাথে চুক্তি বাতিল করে। গুগল মোবাইল সার্ভিসেস (GMS) ও প্লে-স্টোর না থাকায় ফোনের চাহিদা কমে যায়, ফলে ২০২১ সালের পর হুয়াওয়ে বাংলাদেশে ফোন বিক্রি বন্ধ করে দেয়।
অ্যাপ সমস্যার সমাধান এবার তারা ফিরছে নিজস্ব শক্তিশালী ইকোসিস্টেম 'Huawei AppGallery' ও HMS নিয়ে। এতে এখন হোয়াটসঅ্যাপ, ইমেইল ও প্রয়োজনীয় মেসেজিং অ্যাপগুলো সরাসরি কাজ করবে।
নতুন পণ্যের তালিকা

স্মার্টফোন: Mate 80 Pro, Mate X7 (ফোল্ডেবল), Nova 15 Max।


অন্যান্য গ্যাজেট: MatePad 11.5 ট্যাবলেট, Watch Fit 5 সিরিজ, FreeBuds এবং FreeClip।

স্থানীয় পার্টনার বাংলাদেশে হুয়াওয়ের অফিশিয়াল ডিস্ট্রিবিউটর হিসেবে কাজ করবে ডিএক্স গ্রুপ (DX Group), যারা অফিশিয়াল ওয়ারেন্টি ও আসল পার্টসের নিশ্চয়তা দেবে।
কোথায় পাওয়া যাবে? শুরুতে ঢাকার বড় বড় শোরুম (যেমন: গ্যাজেট অ্যান্ড গিয়ার, সুমাশ টেক) এবং শীর্ষ অনলাইন প্ল্যাটফর্ম (দারাজ ও পিকাবু)-এ পাওয়া যাবে। পরবর্তীতে দেশব্যাপী ছড়িয়ে দেওয়া হবে।
ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা আপাতত আমদানির মাধ্যমে বিক্রি শুরু করলেও, হুয়াওয়ে দীর্ঘমেয়াদে বাংলাদেশে নিজস্ব ডিভাইস অ্যাসেম্বলিং বা উৎপাদন কারখানা স্থাপনের কথা ভাবছে। এর ফলে ফোনের দাম আরও কমবে।