Favicon

ভারতের বাজারে বাংলাদেশের পণ্য বাড়লেই কমবে বাণিজ্য ঘাটতি

প্রতিবেদক: প্রফেসর ড. মো. আইনুল ইসলাম অক্টোবর ৮, ২০২৬, ৭:০৮ অপরাহ্ণ বিভাগ: মতামত
ভারতের বাজারে বাংলাদেশের পণ্য বাড়লেই কমবে বাণিজ্য ঘাটতি
ছবি : ড. আইনুল ইসলাম
ভারত থেকে আমদানি নয়, রপ্তানি সক্ষমতাই হোক মূল কৌশল

বাংলাদেশ–ভারত বাণিজ্য ঘাটতি কমানোর সহজ পথ হিসেবে শুধু ভারত থেকে আমদানি কমানোর চিন্তা বাস্তবসম্মত নয়। কারণ বাংলাদেশের শিল্প, তৈরি পোশাকসহ বিভিন্ন উৎপাদন খাত ভারতের কাঁচামাল, তুলা, সুতা, কাপড় ও শিল্প উপকরণের ওপর অনেকাংশে নির্ভরশীল। এসব আমদানি কমিয়ে দিলে উল্টো দেশের উৎপাদন ব্যয় বাড়তে পারে এবং রপ্তানি প্রতিযোগিতা সক্ষমতা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।

তাই বাণিজ্য ঘাটতি কমানোর টেকসই পথ হলো ভারতের বাজারে বাংলাদেশের পণ্যের প্রবেশাধিকার বাড়ানো। বাংলাদেশকে শুধু আমদানি নিয়ন্ত্রণের দিকে না তাকিয়ে রপ্তানি পণ্যের বৈচিত্র্য, মান ও প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বাড়াতে হবে। একই সঙ্গে ভারতের বাজারে বিদ্যমান নন-ট্যারিফ বাধা, অ্যান্টি-ডাম্পিং ব্যবস্থা, বন্দর ও স্থলবন্দরসংক্রান্ত জটিলতা এবং পণ্য পরিবহনের প্রতিবন্ধকতা কমাতে কার্যকর আলোচনা প্রয়োজন।

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—যে পণ্যগুলো বাংলাদেশ ভারত থেকে আমদানি করছে, সেগুলোর কতটা দেশের উৎপাদন সক্ষমতা বাড়াতে ব্যবহৃত হচ্ছে। উৎপাদন ও রপ্তানিতে ব্যবহৃত কাঁচামাল আমদানি যদি শেষ পর্যন্ত বেশি রপ্তানি আয় তৈরি করে, তাহলে সেটিকে নিছক আমদানি হিসেবে দেখা ঠিক হবে না।

বাংলাদেশের লক্ষ্য হওয়া উচিত ভারতের সঙ্গে বাণিজ্য কমানো নয়, বরং আরও ভারসাম্যপূর্ণ ও পারস্পরিকভাবে লাভজনক বাণিজ্য সম্পর্ক তৈরি করা। ভারত যেমন বাংলাদেশের বড় সরবরাহকারী, তেমনি ১৪০ কোটির বেশি মানুষের বিশাল বাজারও বাংলাদেশের জন্য বড় সুযোগ। সেই বাজারে বাংলাদেশের তৈরি পোশাকের পাশাপাশি ওষুধ, কৃষিপণ্য, চামড়া, জুট ও জুটপণ্য, খাদ্যপণ্য এবং অন্যান্য সম্ভাবনাময় পণ্যের রপ্তানি বাড়াতে হবে।

শেষ পর্যন্ত বাণিজ্য ঘাটতি কমানোর সবচেয়ে কার্যকর কৌশল হলো—আমদানি কমানো নয়, রপ্তানি বাড়ানো এবং আমদানিকে উৎপাদন ও রপ্তানি বৃদ্ধির হাতিয়ারে পরিণত করা। বাংলাদেশের বাণিজ্যনীতির মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত এমন একটি সম্পর্ক তৈরি করা, যেখানে দুই দেশই লাভবান হবে এবং বাংলাদেশের ব্যবসা ও শিল্প আরও প্রতিযোগিতামূলক হয়ে উঠবে।

বাণিজ্য ঘাটতি কমানোর প্রধান উপায়

1. ভারতের বাজারে রপ্তানি বহুমুখীকরণ
বর্তমানে বাংলাদেশের রপ্তানি ব্যাপকভাবে তৈরি পোশাকনির্ভর। ওষুধ, চামড়াজাত পণ্য, পাট ও পাটজাত পণ্য, কৃষি-প্রক্রিয়াজাত খাদ্য, প্লাস্টিক, সিরামিক, লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং, আইটি/আইটিইএস এবং বৈদ্যুতিক পণ্য ভারতের বাজারে বাড়ানো যেতে পারে।

2. অশুল্ক বাধা (Non-Tariff Barriers) কমানো
ভারতীয় বাজারে বাংলাদেশের পণ্যের অন্যতম সমস্যা হতে পারে মানসনদ, পরীক্ষা, প্যাকেজিং, কোয়ারেন্টাইন, কাস্টমস ও বিভিন্ন প্রশাসনিক শর্ত। দুই দেশকে Mutual Recognition Agreement (MRA) এবং যৌথ মান-পরীক্ষা ব্যবস্থা বাড়াতে হবে।

3. সীমান্ত হাট ও স্থলবন্দর আধুনিকীকরণ
বেনাপোল, আখাউড়া, বুড়িমারী, বাংলাবান্ধা, ভোমরাসহ গুরুত্বপূর্ণ স্থলবন্দরে ডিজিটাল কাস্টমস, দ্রুত পণ্য খালাস, স্ক্যানিং ও ২৪/৭ কার্যক্রম চালু করলে বাণিজ্য ব্যয় কমবে।

4. ভারতের রাজ্যভিত্তিক বাজারকে লক্ষ্য করা
শুধু দিল্লি বা কলকাতা নয়—পশ্চিমবঙ্গ, আসাম, ত্রিপুরা, মেঘালয়, বিহার, ওড়িশা ও উত্তর-পূর্ব ভারতের বাজারের জন্য পৃথক রপ্তানি কৌশল প্রয়োজন। বাংলাদেশের ভৌগোলিক নৈকট্য এখানে বড় সুবিধা।

5. রপ্তানি পণ্যের মূল্য সংযোজন বৃদ্ধি
কাঁচা বা অর্ধ-প্রক্রিয়াজাত পণ্য রপ্তানির পরিবর্তে processed food, branded garments, pharmaceuticals, finished leather goods এবং engineered products রপ্তানি করতে হবে। এতে একই পরিমাণ পণ্যে বেশি রপ্তানি আয় হবে।

6. ভারত থেকে আমদানির ক্ষেত্রে উৎপাদনশীলতা বাড়ানো
তুলা, শিল্পের কাঁচামাল, যন্ত্রপাতি ও intermediate goods আমদানি করে দেশে উৎপাদন ও রপ্তানি বাড়ানো গেলে আমদানি সরাসরি নেতিবাচক নয়। লক্ষ্য হওয়া উচিত “import substitution + export expansion”।

7. যৌথ উৎপাদন ও Global Value Chain তৈরি
ভারতীয় বিনিয়োগ ও বাংলাদেশের শ্রম/ভৌগোলিক সুবিধা কাজে লাগিয়ে automobile components, pharmaceuticals, electronics, textiles, agro-processing ও light engineering-এ joint venture করা যেতে পারে। বাংলাদেশে উৎপাদিত পণ্য ভারতসহ তৃতীয় দেশেও রপ্তানি করা সম্ভব হবে।

8. রুপিতে/স্থানীয় মুদ্রায় বাণিজ্য সম্প্রসারণের সুযোগ
বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ কমাতে নির্বাচিত ক্ষেত্রে স্থানীয় মুদ্রায় বাণিজ্য নিষ্পত্তির সুযোগ বাড়ানো যেতে পারে। তবে এর কার্যকারিতা নির্ভর করবে দুই দেশের বাণিজ্য ভারসাম্য, মুদ্রার গ্রহণযোগ্যতা ও ব্যাংকিং ব্যবস্থার ওপর।

9. FTA/CEPA আলোচনায় রপ্তানি স্বার্থকে অগ্রাধিকার

ভবিষ্যৎ কোনো Comprehensive Economic Partnership Agreement হলে বাংলাদেশের লক্ষ্য হওয়া উচিত—ভারতীয় বাজারে বাংলাদেশের পণ্যের শুল্ক ও অশুল্ক বাধা হ্রাস, সেবা রপ্তানি বৃদ্ধি এবং বিনিয়োগ সুবিধা নিশ্চিত করা।

10. সেবা রপ্তানি বাড়ানো

শুধু পণ্য নয়—আইটি, সফটওয়্যার, ফ্রিল্যান্সিং, স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা, পরিবহন ও পেশাগত সেবা ভারতের বাজারে রপ্তানি করা সম্ভব। এতে দৃশ্যমান বাণিজ্য ঘাটতির বাইরে সেবা বাণিজ্য থেকেও আয় বাড়বে।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নীতিগত পরিবর্তন

বাংলাদেশের নীতি হওয়া উচিত:

“ভারত থেকে কম আমদানি” → “ভারতে বেশি রপ্তানি + উৎপাদনশীল আমদানি + যৌথ উৎপাদন”

অর্থাৎ, বাণিজ্য ঘাটতি কমানোর টেকসই পথ হলো Import Compression নয়, Export Expansion।

বিশেষ করে বাংলাদেশের জন্য একটি “India Market Export Strategy 2030” তৈরি করা যেতে পারে, যেখানে ২০–৩০টি সম্ভাবনাময় পণ্য, প্রতিটি পণ্যের ভারতীয় বাজার, শুল্ক/অশুল্ক বাধা, সম্ভাব্য রপ্তানি মূল্য এবং প্রয়োজনীয় নীতিগত সংস্কার নির্ধারণ করা থাকবে।