মেলবোর্নের মঞ্চে কালজয়ী নজরুল
কবি কাজী নজরুল ইসলামের ৫০তম মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে অস্ট্রেলিয়ার মেলবোর্নে অনুষ্ঠিত হয়েছে বিশেষ সাংস্কৃতিক আয়োজন ‘চিরন্তন: আমারে দেব না ভুলিতে’। রোববার (৪ অক্টোবর) ড্যানডেনংয়ের ড্রাম থিয়েটারে আয়োজিত এ অনুষ্ঠানে প্রায় ৩৬০ জন দর্শক উপস্থিত ছিলেন।
মেলবোর্নপ্রবাসী নজরুলসংগীতশিল্পী ও সাংস্কৃতিক কিউরেটর আদিলা নূরের পরিকল্পনা ও সৃজনশীল নির্দেশনায় আয়োজিত অনুষ্ঠানে গান, কবিতা, নৃত্য ও নাটকের মাধ্যমে নজরুলের সৃষ্টিশীলতা, সাম্য, ভালোবাসা ও মানবতার দর্শন তুলে ধরা হয়।
অনুষ্ঠানের অন্যতম আকর্ষণ ছিল নজরুলের নাটক ‘ঝিলিমিলি’ ও গীতিনাট্য ‘কাবেরী তীরে’র মঞ্চায়ন। আয়োজকদের ভাষ্য অনুযায়ী, অস্ট্রেলিয়ায় প্রথমবারের মতো একই আয়োজনে এই দুটি সৃষ্টি মঞ্চস্থ করা হয়।
আদিলা নূর বলেন, “এই আয়োজনের মাধ্যমে আমরা নজরুলের সৃষ্টিশীলতার বহুমাত্রিক দিকগুলো তুলে ধরতে চেয়েছি। আমাদের প্রত্যাশা, তাঁর সাম্য, ভালোবাসা ও মানবতার চিরন্তন বার্তা নতুন প্রজন্মকে আলোড়িত করবে।”
তিনি আরও বলেন, সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য ধরে রাখা এবং তা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেওয়া গুরুত্বপূর্ণ। শেকড় থেকে দূরে বসবাসের কারণে প্রবাসীদের জন্য বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
অনুষ্ঠানের প্রথম পর্বের নাম ছিল ‘সুর ও বাণীর অর্ঘ্য’। এতে নজরুলের নির্বাচিত চারটি গান, কবিতা ও নৃত্য পরিবেশন করা হয়। স্থানীয় নৃত্যশিল্পী ক্রিস ও অনিলের দ্বৈত নৃত্যের মধ্য দিয়ে এ পর্ব শুরু হয়।
নজরুলের কবিতা ‘অভিশাপ’ ও গান ‘শূন্য এ বুকে’র সমন্বয়ে বিশেষ একটি পরিবেশনাও ছিল এ পর্বে। এতে আবৃত্তি করেন তন্বীপ্রিয়া এবং গান পরিবেশন করেন আদিলা নূর। ‘ফুলের জলসায় নীরব কেন কবি’ গান দিয়ে শেষ হয় প্রথম পর্ব।
অনুষ্ঠানে মূল বক্তব্য দেন ২০২৩ সালের নজরুল পুরস্কারপ্রাপ্ত অধ্যাপক ইরশাদ আহমেদ শাহীন। নজরুলের জীবন, সাহিত্য ও দর্শন নিয়ে বক্তব্যে তিনি বলেন, নজরুল শুধু বিদ্রোহী কবি ছিলেন না; তিনি মানবতা, সাম্য ও সামাজিক সম্প্রীতিরও শক্তিশালী কণ্ঠস্বর ছিলেন।
প্রবাসে বেড়ে ওঠা নতুন প্রজন্মের কাছে নজরুলের দর্শন পৌঁছে দিতে ‘চিরন্তন’-এর মতো আয়োজন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
দ্বিতীয় পর্বে মঞ্চস্থ হয় নজরুলের গীতিনাট্য ‘ঝিলিমিলি’। বাংলাদেশের নাট্যব্যক্তিত্ব বৃন্দাবন দাসের নির্দেশনায় এতে অভিনয় করেন বৃন্দাবন দাস, শাহানাজ খুশী, দিব্য জ্যোতি ও সৌতি মালবিকা। সংগীত পরিবেশন করেন মেলবোর্নপ্রবাসী অর্পণ ও আদিলা নূর।
শেষ পর্বে মঞ্চস্থ হয় নজরুলের গীতিনাট্য ‘কাবেরী তীরে’। কাবেরী নদীর তীরে গড়ে ওঠা প্রেমের গল্পকে কেন্দ্র করে রচিত এ গীতিনাট্য পরিচালনা ও কোরিওগ্রাফি করেন মেলবোর্নপ্রবাসী পূরবী চৌধুরী। এতে একদল নৃত্যশিল্পীর পাশাপাশি সংগীত পরিবেশন করেন নজরুলসংগীতশিল্পী অজয় রায় ও আদিলা নূর।
অনুষ্ঠান উপলক্ষে একটি স্মারক সংকলনও প্রকাশ করা হয়। এতে খায়রুল আনাম শাকিল, ড. প্রিয়াঙ্কা গোপ, ড. লীনা তাপসী খান, অধ্যাপক ইরশাদ আহমেদ শাহীন, ড. চঞ্চল খান ও শারমিন সাথী ময়নার লেখা স্থান পায়।
দর্শকদের উচ্ছ্বসিত করতালি ও স্ট্যান্ডিং ওভেশনের মধ্য দিয়ে শেষ হয় অনুষ্ঠান। আয়োজকেরা মনে করেন, এ ধরনের আয়োজনের মাধ্যমে নজরুলের সৃষ্টির চিরকালীন প্রাসঙ্গিকতার পাশাপাশি প্রবাসে বেড়ে ওঠা নতুন প্রজন্মের বাঙালিদের সঙ্গে তাঁদের সাংস্কৃতিক শেকড়ের সংযোগ আরও দৃঢ় হবে।