Favicon

অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে বেশি গুরুত্ব দিতে হবে: বিআইডিএস মহাপরিচালক

প্রতিবেদক: ST Reporter জুন ৫, ২০২৬, ৯:২৩ অপরাহ্ণ বিভাগ: মেট্রোপলিটন
অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে বেশি গুরুত্ব দিতে হবে: বিআইডিএস মহাপরিচালক
বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজ (বিআইডিএস)-এর মহাপরিচালক ড. এ কে এনামুল হক। ছবি : সংগৃহীত
সরবরাহ বৃদ্ধি ও প্রবৃদ্ধিতে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ প্রয়োজন হবে

বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজ (বিআইডিএস)-এর মহাপরিচালক ড. এ কে এনামুল হক বলেছেন, বৈশ্বিক সংঘাত, খাদ্য সংকট এবং জলবায়ুজনিত ফসলহানির কারণে বাংলাদেশে দ্রুত মূল্যস্ফীতি কমানো কঠিন হতে পারে। তবে সরবরাহমুখী পদক্ষেপের মাধ্যমে সরকারকে মূল্যস্ফীতি সহনীয় পর্যায়ে রাখতে হবে।

আগামী অর্থবছর (২০২৬-২০২৭)-এর বাজেটে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, জিডিপি প্রবৃদ্ধি বৃদ্ধি এবং রাজস্ব আহরণ বাড়ানোর সম্ভাব্য অগ্রাধিকার নিয়ে বাসস’কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, ‘ফসলের ক্ষতি হয়েছে এবং বৈশ্বিক অনিশ্চয়তা এখনও অনেক বেশি। তাই দ্রুত মূল্যস্ফীতি কমানো খুবই কঠিন হবে।’

তিনি বলেন, সরকারকে শুধু আর্থিক সহায়তামূলক কর্মসূচির ওপর নির্ভর না করে আমদানি ও সরকারি বিতরণ ব্যবস্থার মাধ্যমে খাদ্য সরবরাহ বাড়ানোর দিকে গুরুত্ব দিতে হবে।

তিনি সতর্ক করে বলেন, ‘যদি সরবরাহ না বাড়ে এবং বাজার পুরোপুরি বেসরকারি খাতের ওপর ছেড়ে দেওয়া হয়, তাহলে মূল্যস্ফীতির চাপ আরও বৃদ্ধি পাবে।’

ড. এনামুল জোর দিয়ে বলেন, আসন্ন বাজেটের মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি।

তিনি বলেন, ‘অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির গতি বজায় রাখা গেলে অন্যান্য সামষ্টিক অর্থনৈতিক সূচকও ধীরে ধীরে সঠিক অবস্থায় আনা সম্ভব হবে।’

রাজস্ব আহরণ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, বাংলাদেশের করনীতি কাঠামো এখনও বড় ধরনের গঠনগত দুর্বলতায় ভুগছে এবং অর্থনৈতিক সম্প্রসারণের চেয়ে রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রার ওপর অতিরিক্ত গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

তিনি বলেন, ‘আমরা বিনিয়োগ ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি না বাড়িয়ে রাজস্ব বাড়ানোর চেষ্টা করছি। এটি একটি বড় নীতিগত ভুল।’

বিআইডিএস মহাপরিচালক যুক্তি দেন যে, জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৪ শতাংশের নিচে থাকলে উচ্চ রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা বাস্তবসম্মতভাবে অর্জন করা সম্ভব নয়।

তিনি বলেন, ‘অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি দুর্বল থাকলে বড় রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের চেষ্টা কার্যকর হবে না।’

এর পরিবর্তে তিনি বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টিকে রাজস্ব কৌশলের প্রধান চালিকাশক্তি করার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।

তিনি বলেন, ‘টেকসইভাবে রাজস্ব বাড়ানোর মাত্র দুটি সহজ উপায় রয়েছে- বিনিয়োগ এবং কর্মসংস্থান বাড়ানো।’

বিআইডিএস-এর মহাপরিচালক বলেন, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের কারণে জ্বালানি ও সারের দাম বৃদ্ধি পেয়েছে, যা বিশ্বব্যাপী কৃষি উৎপাদন ব্যয় বাড়িয়ে আগামী মাসগুলোতে খাদ্যের দাম আরও বাড়াতে পারে।

এই অর্থনীতিবিদ জোর দিয়ে বলেন, খাদ্য-অনিরাপদ ও ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীকে সম্প্রসারিত ওএমএস কর্মসূচি এবং সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর মাধ্যমে সরাসরি খাদ্য সহায়তা দিতে হবে।

তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক মানুষ খাদ্য নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে। তাই শুধু নগদ অর্থ দেওয়ার চেয়ে খাদ্য সরবরাহ সহায়তা বেশি গুরুত্বপূর্ণ।’

ড. এনামুল বিদ্যমান কল্যাণমূলক কর্মসূচিগুলোকে একটি সমন্বিত ‘ফ্যামিলি কার্ড’ ব্যবস্থার আওতায় আনার আহ্বান জানান, যাতে দক্ষতা বৃদ্ধি পায় এবং অপব্যবহার কমে।

তিনি বলেন, উচ্চ করহার এবং নীতিগত অনিশ্চয়তার কারণে অনেক উদ্যোক্তা ও ফ্রিল্যান্সার তাদের ব্যবসা বিদেশে স্থানান্তর করছেন, যেখানে করের বোঝা তুলনামূলক কম।

তিনি আরও বলেন, কিছু বাংলাদেশি ফ্রিল্যান্সার অতিরিক্ত কর ও নিয়ন্ত্রক চাপের আশঙ্কায় তাদের বৈদেশিক আয় দেশে আনতে অনীহা প্রকাশ করেন।

এ প্রসঙ্গে তিনি অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও বিনিয়োগ উৎসাহিত করার লক্ষ্যে করনীতি পুনর্গঠনের জন্য একটি স্বাধীন বিশেষজ্ঞ কর কমিশন গঠনেরও সুপারিশ করেন।

তিনি বলেন, ‘করনীতির মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত অর্থনীতিকে শক্তিশালী করা, শুধু ব্যয় নির্বাহের জন্য রাজস্ব সংগ্রহ নয়।’

তিনি কর-জিডিপি অনুপাত বাড়ানোর জন্য একটি সুস্পষ্ট দীর্ঘমেয়াদি কৌশল প্রণয়নেরও সুপারিশ করেন।

তিনি বলেন, ‘আমরা প্রায়ই ঘোষণা দিই যে আগামী বছর কর আদায় বাড়বে, কিন্তু কীভাবে তা অর্জন করা হবে, সেই কৌশল খুব কমই ব্যাখ্যা করি।’

তার মতে, করনীতি প্রণয়ন ও কর আদায় প্রশাসনকে আলাদা করার মাধ্যমে বাংলাদেশের দীর্ঘমেয়াদি প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার প্রয়োজন।

তিনি বলেন, ‘যে কর্তৃপক্ষ কর সংগ্রহ করবে, তাদেরই আবার স্বতন্ত্রভাবে করহার ও করনীতি নির্ধারণ করা উচিত নয়।’