Favicon

গঙ্গা-কপোতাক্ষ সেচ প্রকল্পের নকশা পুনর্গঠনের উদ্যোগ

প্রতিবেদক: ST Report জুন ৯, ২০২৬, ৯:১৭ অপরাহ্ণ বিভাগ: মেট্রোপলিটন
গঙ্গা-কপোতাক্ষ সেচ প্রকল্পের নকশা পুনর্গঠনের উদ্যোগ
ছবি : এআই
জিকে সেচ প্রকল্পে পাম্প আধুনিকায়ন পরিকল্পনা গ্রহণ

দেশের বৃহত্তম ভূ-উপরিস্থ সেচ ব্যবস্থা গঙ্গা-কপোতাক্ষ (জিকে) সেচ প্রকল্পের পাম্পিং ব্যবস্থায় বড় ধরনের সংস্কার ও নকশা পুনর্গঠনের উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে।

শুষ্ক মৌসুমে উজানে পানি প্রবাহের দিক পরিবর্তনের কারণে গঙ্গা (বাংলাদেশে পদ্মা) নদীর পানি মারাত্মকভাবে কমে গেলেও নিরবচ্ছিন্ন পানি উত্তোলন নিশ্চিত করার লক্ষ্যে এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।

নতুন প্রকৌশলগত নকশা অনুযায়ী, প্রকল্প কর্তৃপক্ষ ইনটেক চ্যানেলে পানি উত্তোলনের ন্যূনতম প্রয়োজনীয় স্তর বর্তমান ৩.৯ মিটার থেকে কমিয়ে ২.৫ মিটারে নামিয়ে আনার পরিকল্পনা করেছে। এই কৌশলগত সমন্বয়ের ফলে শুষ্ক মৌসুমে নদীর পানি উল্লেখযোগ্য হারে কমে গেলেও বিশাল পাম্পগুলো সচল রাখা সম্ভব হবে।

সম্প্রতি কুষ্টিয়ায় জিকে প্রকল্প পাম্প হাউসের নির্বাহী প্রকৌশলী মিজানুর রহমান বাসস-কে এই উন্নয়ন সম্পর্কে জানান।

১৯৬২ সালে চালু হওয়া জিকে প্রকল্পটি বাংলাদেশের কৃষি অবকাঠামোয় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, যা দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের খাদ্য উৎপাদন অব্যাহত রাখতে অতীব প্রয়োজনীয়। এই প্রকল্পের বিশাল কমান্ড এরিয়া প্রায় ১ লাখ ৯৭ হাজার ৫০০ হেক্টর এবং সেচযোগ্য এলাকা প্রায় ৯৫ হাজার ৫০০ হেক্টর। 

তবে পুরোনো অবকাঠামো, অচল পাম্প এবং পলি জমে ভরাট হওয়া খালগুলোর কারণে কয়েক দশক ধরে এর কার্যকর পরিধি (সেচ এলাকা) কমে ৫৫ হাজার হেক্টরে দাঁড়িয়েছে।

প্রকল্প কর্মকর্তারা জানান, গঙ্গার পানির স্তর ৪.৫ মিটারের নিচে নেমে গেলেই পাম্পের কার্যক্রম ব্যাহত হয়। ১৯৭৫ সালে ভারতের পশ্চিমবঙ্গে ফারাক্কা বাঁধ চালুর পর থেকে এই সংকট আরো প্রকট হয়েছে, যা শুষ্ক মৌসুমে নদীর পানিবিন্যাসকে মৌলিকভাবে পরিবর্তন করেছে।

পরিস্থিতির ভয়াবহতা তুলে ধরে নির্বাহী প্রকৌশলী মিজানুর রহমান বাসস-কে বলেন, ২০২৪ সালে এই দুর্বলতাগুলো প্রকট হয়ে ওঠে। সে বছরের শুষ্ক মৌসুমে হার্ডিঞ্জ ব্রিজ পয়েন্টের কাছে পানির স্তর চার মিটারের নিচে নেমে যায়, যার ফলে পাম্পগুলো পানি উত্তোলনে সম্পূর্ণ অক্ষম হয়ে পড়ে এবং সকল সেচ কার্যক্রম পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়। 

তিনি বলেন, ‘পাম্পগুলো একেবারেই চালানো যাচ্ছিল না, ফলে পুরো প্রকল্প এলাকাটি অত্যাবশ্যকীয় সেচ সুবিধা থেকে বঞ্চিত হয়।’

বারবার ফিরে আসা এই হুমকি মোকাবিলায় বর্তমান সরকার ১ হাজার ২০০ কোটি টাকার নকশা পুনর্গঠন প্রকল্প হাতে নিয়েছে, যা ২০২৯ সালের মধ্যে শেষ হওয়ার কথা রয়েছে।  

নদীর পানির নিম্নস্তর থেকে পানি উত্তোলনের সক্ষমতা তৈরির মাধ্যমে এই উদ্যোগটি জলবায়ু পরিবর্তন এবং মৌসুমি পানি সংকটের মুখে প্রকল্পের সহনশীলতা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি করবে বলে আশা করা যাচ্ছে। 

তবে জিকে প্রকল্পের কর্মকর্তারা আশাবাদের পাশাপাশি সতর্ক করে বলেন, নদীর মূল প্রবাহ ক্রমাগত কমতে থাকলে কেবল কাঠামোগত পরিবর্তনই যথেষ্ট নাও হতে পারে।

এ বিষয়ে প্রকৌশলী মিজানুর রহমান বলেন, ‘আমরা যদি পানি উত্তোলনের ন্যূনতম স্তর ১.৫ মিটার কমাতেও সফল হই, তবুও এর চূড়ান্ত সুফল নির্ভর করবে উজানের পর্যাপ্ত ও স্থিতিশীল পানি প্রবাহ পাওয়ার ওপর।’

উল্লেখ্য, দেশের কৃষি ইতিহাসে জিকে প্রকল্প এক অগ্রণী ভূমিকা পালন করে। ১৯৫১ সালে প্রাথমিক সমীক্ষা এবং ১৯৫০-এর দশকের মাঝামাঝি সময়ে এর বাস্তবায়ন শুরু হয়। একটি ‘লিফট-কাম-গ্র্যাভিটি’ সেচ ব্যবস্থা হিসেবে পরিকল্পিত এই প্রকল্পটি পদ্মা থেকে পানি উত্তোলন করে কুষ্টিয়া, চুয়াডাঙ্গা, ঝিনাইদহ এবং মাগুরা জেলার মধ্য দিয়ে বয়ে চলা বিশাল খাল নেটওয়ার্কে পানি সরবরাহ করে।   

বছরের পর বছর ধরে উজানে পানির প্রাপ্যতা হ্রাস, ইনটেক চ্যানেলে অতিরিক্ত পলি জমা এবং পুরোনো যন্ত্রপাতির কারণে এর সর্বোচ্চ কার্যক্ষমতা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছে।

বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে কথা বলে এবং ঐতিহাসিক নথিপত্র থেকে জানা যায়, পাম্পগুলোর মূল নকশার মানদণ্ড নদীর তৎকালীন যে অবস্থার সাথে সামঞ্জস্য রেখে করা হয়েছিল, শুষ্ক মাসগুলোতে নদীর সেই অবস্থা এখন আর বিরাজমান নেই।

এদিকে, আন্তর্জাতিক ফারাক্কা কমিটির চেয়ারম্যান সৈয়দ টিপু সুলতান সম্প্রতি গণমাধ্যমকর্মীদের একটি দলের নেতৃত্বে কুষ্টিয়া ও রাজবাড়ীতে পদ্মার পানিনির্ভর অঞ্চলগুলো পরিদর্শন করেন।
  
চলমান সংকট নিয়ে মন্তব্য করতে গিয়ে তিনি জোর দিয়ে বলেন, যদি একটি ন্যায্য ও পারস্পরিক দ্বিপক্ষীয় সমাধান অধরাই থেকে যায়, তবে গঙ্গার পানি বণ্টন সংক্রান্ত দীর্ঘদিনের বিরোধটি জাতিসংঘের টেবিলে উত্থাপন করা উচিত।
 
শত শত কিলোমিটার দীর্ঘ প্রধান ও শাখা খাল নিয়ে গঠিত জিকে নেটওয়ার্ক গ্রামীণ জীবনযাত্রা ও জাতীয় খাদ্য নিরাপত্তার জন্য আজও অপরিহার্য।