ডিজিটাল অর্থনীতিতে বিনিয়োগ বাড়াতে নীতি সহায়তা চায় ব্যবসায়ীরা।
ঢাকা, ৯ আগস্ট ২০২৬ (রবিবার): উদ্ভাবন, বিনিয়োগ, সাইবার নিরাপত্তা, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ও ডিজিটাল অবকাঠামো উন্নয়নের মাধ্যমে বাংলাদেশের ডিজিটাল অর্থনীতিকে আরও শক্তিশালী করতে সরকার ও বেসরকারি খাতের মধ্যে অংশীদারিত্ব জোরদারের ওপর গুরুত্ব দিয়েছে বাংলাদেশে আমেরিকান চেম্বার অব কমার্স (আমচ্যাম)।
রবিবার রাজধানীর দ্য ওয়েস্টিন ঢাকায় আয়োজিত “বাংলাদেশের ডিজিটাল ভবিষ্যতের পথে অগ্রযাত্রা: উদ্ভাবন, বিনিয়োগ ও আইসিটি-নির্ভর প্রবৃদ্ধির নীতিগত অগ্রাধিকার” শীর্ষক নীতি সংলাপে এ বিষয়গুলো উঠে আসে।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন প্রধানমন্ত্রীর পোস্ট, টেলিযোগাযোগ, আইসিটি, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিবিষয়ক উপদেষ্টা রেহান আসিফ আসাদ।
উদ্বোধনী বক্তব্যে আমচ্যামের সভাপতি ও মাস্টারকার্ডের ভাইস প্রেসিডেন্ট সৈয়দ মোহাম্মদ কামাল ব্যক্তিগত তথ্য সুরক্ষা আইন (PDPA) অনুমোদনের জন্য সরকারকে ধন্যবাদ জানান। তিনি বলেন, আইনটি প্রণয়নের শুরু থেকেই আমচ্যাম ধারাবাহিকভাবে সংশ্লিষ্ট প্রক্রিয়ায় সম্পৃক্ত ছিল এবং চূড়ান্ত আইনে সংগঠনটির অধিকাংশ সুপারিশ প্রতিফলিত হয়েছে।
তিনি অর্থ আইন ২০২৬-এর আওতায় ফ্রিল্যান্সার ও কনটেন্ট ক্রিয়েটরদের কর অব্যাহতি এবং কম্পিউটার, ডিজিটাল ডিভাইস ও সেমিকন্ডাক্টর-সংশ্লিষ্ট উপকরণের ওপর শুল্ক সুবিধাসহ বিভিন্ন উদ্যোগকে স্বাগত জানান।
তবে প্রযুক্তি খাতের বিকাশে আরও কিছু নীতি সংস্কারের প্রয়োজন রয়েছে বলে উল্লেখ করেন কামাল। তিনি ১ লাখ গ্রাহক সীমার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট নতুন ডিজিটাল স্থায়ী স্থাপনা বিধানের বিষয়ে স্পষ্টতা, আইএসপি খাতের মোট প্রাপ্তির ওপর টার্নওভার কর ১ শতাংশ থেকে ১.৫ শতাংশে বৃদ্ধির বিষয়টি পুনর্বিবেচনা এবং প্রযুক্তি কোম্পানি ও স্টার্টআপের জন্য বৈদেশিক অর্থপ্রবাহ ও বহির্মুখী আন্তর্জাতিক লেনদেন সহজ করার আহ্বান জানান।
নীতিনির্ধারণ প্রক্রিয়া এবং সংশ্লিষ্ট জাতীয় ব্যবসায়িক ফোরামে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আরও সম্পৃক্ত করার ওপরও গুরুত্বারোপ করেন তিনি। তাঁর মতে, এতে বৈশ্বিক অভিজ্ঞতা ও আন্তর্জাতিক সর্বোত্তম চর্চা নীতিনির্ধারণে যুক্ত হবে এবং বাংলাদেশে আরও প্রতিযোগিতামূলক, স্বচ্ছ ও বিনিয়োগবান্ধব ব্যবসায়িক পরিবেশ গড়ে উঠবে।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে রেহান আসিফ আসাদ আইসিটি ও টেলিযোগাযোগকে সরকারের অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত খাত হিসেবে উল্লেখ করে এর উন্নয়নে পাঁচটি মূল অগ্রাধিকার তুলে ধরেন।
প্রথম অগ্রাধিকার হিসেবে তিনি পাঁচ বছর মেয়াদি কর কাঠামোর আওতায় ধারাবাহিক ও ভবিষ্যতমুখী নীতি প্রণয়নের কথা বলেন। তিনি জানান, বৈশ্বিক গড় ২২–২৭ শতাংশের তুলনায় বাংলাদেশের টেলিযোগাযোগ খাতে কার্যকর করের বোঝা ৫১–৫৬ শতাংশ। একইসঙ্গে তিনি সিম কর প্রত্যাহারের বিষয়টি তুলে ধরেন।
দ্বিতীয়ত, মোবাইল ও ব্রডব্যান্ড সংযোগের মান ও সক্ষমতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেন তিনি। তাঁর মতে, গ্রাহকসংখ্যার দিক থেকে বাংলাদেশ বিশ্বে সপ্তম অবস্থানে থাকলেও সেবার মানের ক্ষেত্রে দেশ এখনও পিছিয়ে রয়েছে।
তৃতীয় অগ্রাধিকার হিসেবে তিনি “ওয়ান সিটিজেন, ওয়ান আইডি, ওয়ান ডিজিটাল ওয়ালেট” উদ্যোগের আওতায় শক্তিশালী ডিজিটাল পাবলিক অবকাঠামো গড়ে তোলার পরিকল্পনা তুলে ধরেন। এ উদ্যোগে এস্তোনিয়ার এক্স-রোড প্ল্যাটফর্ম অনুসরণ করা হবে এবং এটি বিনামূল্যে ব্যবহারের সুযোগ থাকবে। প্রতিটি নাগরিকের ডিজিটাল পরিচয় ব্যাংক হিসাব ও জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (NBR) সঙ্গে সংযুক্ত করার পরিকল্পনার কথাও জানান তিনি।
চতুর্থ অগ্রাধিকার হিসেবে এআই-প্রস্তুত দক্ষ মানবসম্পদ গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়। রেহান আসিফ আসাদ বলেন, বাংলাদেশে প্রতিবছর প্রায় ২৩ হাজার থেকে ৩০ হাজার প্রকৌশল ও বিজ্ঞান বিষয়ে স্নাতক বের হন। তাঁদের এআই, সাইবার নিরাপত্তা ও ডেটা বিষয়ে দক্ষ করে তোলার পাশাপাশি স্কুল পর্যায়ের পাঠ্যক্রমেও এসব বিষয় অন্তর্ভুক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হবে।
পঞ্চম অগ্রাধিকার হিসেবে তিনি ইলেকট্রনিক্স উৎপাদন খাত সম্প্রসারণের কথা বলেন। এ ক্ষেত্রে পোশাক শিল্পের অনুরূপ প্রণোদনা দেওয়ার প্রয়োজনীয়তার কথা উল্লেখ করে ভিয়েতনামের উদাহরণ তুলে ধরেন তিনি। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, এক দশকে ভিয়েতনামের কনজিউমার ইলেকট্রনিক্স রপ্তানি ১ বিলিয়ন মার্কিন ডলার থেকে বেড়ে ২১৭ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত হয়েছে।
ব্রডব্যান্ড অবকাঠামোর গুরুত্ব তুলে ধরে তিনি জাতিসংঘ ও আন্তর্জাতিক টেলিযোগাযোগ ইউনিয়নের একটি গবেষণার উদ্ধৃতি দিয়ে বলেন, ব্রডব্যান্ডের বিস্তার ১০ শতাংশ বাড়লে জাতীয় জিডিপিতে প্রায় ১ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হতে পারে।
আমচ্যামের আইসিটি সাবকমিটির চেয়ার ও ওরাকলের বাংলাদেশ, নেপাল ও ভুটানের কান্ট্রি ম্যানেজিং ডিরেক্টর রুবাবা দৌলা-এর সঞ্চালনায় সংলাপে চারটি মূল বিষয়ে আলোচনা হয়—প্রতিযোগিতামূলক ডিজিটাল অর্থনীতি গড়ে তোলা, বিশ্বস্ত ডিজিটাল অবকাঠামো উন্নয়ন, এআই ও উদ্ভাবন ত্বরান্বিত করা এবং সরকার-শিল্পখাতের অংশীদারিত্ব জোরদার করা।
আমচ্যামের আইসিটি খাতের নেতৃবৃন্দ এবং সিটিব্যাংক এন.এ., সিসকো, এইচএসবিসি, মাস্টারকার্ড, মেটলাইফ, পাঠাও, পিডব্লিউসি, স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংক, শপআপ ও ভিসাসহ বিভিন্ন সদস্য প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিরা আলোচনায় অংশ নেন।
তারা মেট্রো ও টোল ব্যবস্থায় ওপেন-লুপ টিকিটিং চালু, আন্তর্জাতিক পেমেন্ট নেটওয়ার্কের জন্য বাংলা কিউআর ও “ওয়ান সিটিজেন, ওয়ান ওয়ালেট” উদ্যোগ উন্মুক্ত করা এবং এনবিআর স্টার্টআপ স্যান্ডবক্সের আওতায় ১৫ শতাংশ ভ্যাট অব্যাহতির বিষয়টি পুনর্বিবেচনার প্রস্তাব দেন।
এ ছাড়া ব্যাংক ও এনবিএফআইয়ের ক্লাউড নীতিকে ব্যক্তিগত তথ্য সুরক্ষা আইনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করে পাবলিক ক্লাউড ব্যবহারের সুযোগ সৃষ্টি, দ্রুত জাতীয় তথ্য ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ গঠন, ডিজিটাল স্বাক্ষর ও আইনগতভাবে কার্যকর ইলেকট্রনিক চুক্তির ব্যবস্থা এবং জাতীয় সাইবার নিরাপত্তা জোরদারের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।
এআই ও ডেটা ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে দক্ষতার ঘাটতি পূরণে শিল্পখাত ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মধ্যে সহযোগিতা বাড়ানোরও আহ্বান জানান ব্যবসায়ী প্রতিনিধিরা।
ব্যবসায়ী প্রতিনিধিদের প্রস্তাবের জবাবে প্রধান অতিথি জানান, আরএফআইডি-ভিত্তিক স্বয়ংক্রিয় টোল আদায় ব্যবস্থা পরীক্ষামূলকভাবে চালু রয়েছে।
তিনি বলেন, প্রাথমিক পদক্ষেপ হিসেবে বাংলাদেশ ব্যাংক আন্তর্জাতিক অর্থপ্রবাহের জন্য বাংলা কিউআর উন্মুক্ত করতে সম্মত হয়েছে। “ওয়ান সিটিজেন, ওয়ান আইডি” প্ল্যাটফর্ম দেশীয় ও আন্তর্জাতিক উভয় পেমেন্ট নেটওয়ার্কের জন্য উন্মুক্ত থাকবে।
স্টার্টআপ স্যান্ডবক্সের বিধানগুলো বৃহত্তর স্টার্টআপ কমিউনিটির সঙ্গে পরামর্শের ভিত্তিতে আরও কার্যকরভাবে পরিমার্জন করা হবে বলেও জানান তিনি।
জাতীয় সাইবার নিরাপত্তাকে তাঁর তাৎক্ষণিক অগ্রাধিকার হিসেবে উল্লেখ করে রেহান আসিফ আসাদ জানান, চলতি বছরের চতুর্থ প্রান্তিকে সরকার, বেসরকারি খাত, শিক্ষাবিদ ও গবেষকদের সমন্বয়ে একটি যৌথ দলের মাধ্যমে জাতীয় এআই নীতি প্রণয়নের কাজ শুরু হবে।
বাংলাদেশের ডিজিটাল অবকাঠামোর সক্ষমতা বাড়াতে সাবমেরিন কেবল ব্যবস্থার সম্প্রসারণের জরুরি প্রয়োজনীয়তার ওপরও গুরুত্ব দেন তিনি।
রেহান আসিফ আসাদ জানান, বর্তমানে বাংলাদেশের সাবমেরিন কেবল সক্ষমতা প্রায় ৬ টেরাবাইট, যেখানে সর্বোচ্চ জাতীয় চাহিদা ১২ টেরাবাইটে পৌঁছেছে। একই সময়ে প্রতি দুই বছরে ডেটা ট্রাফিক দ্বিগুণ হচ্ছে।
তিনি বলেন, নতুন সাবমেরিন কেবল স্থাপনে দুই থেকে তিন বছর সময় লাগে। ফলে বাংলাদেশের ডিজিটাল সার্বভৌমত্ব নিশ্চিত করতে পর্যাপ্ত ও নির্ভরযোগ্য সাবমেরিন কেবল সক্ষমতা গড়ে তোলা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
অনুষ্ঠানের সমাপনী পর্বে ধন্যবাদ জ্ঞাপন করেন আমচ্যামের ভাইস প্রেসিডেন্ট ও মেটলাইফ বাংলাদেশ-এর প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা আলা উদ্দিন আহমেদ।
আলোচনা সভায় আমচ্যামের নির্বাহী কমিটির সদস্য, আইসিটি খাতের সদস্য প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতিনিধিবৃন্দ এবং মার্কিন দূতাবাসের কর্মকর্তারা অংশ নেন।
বাংলাদেশের ডিজিটাল রূপান্তরকে এগিয়ে নিতে সরকারি ও বেসরকারি খাতের মধ্যে সহযোগিতা আরও জোরদারের লক্ষ্যেই এ নীতি সংলাপের আয়োজন করা হয়।
অনুষ্ঠানটির সহযোগী প্রতিষ্ঠান ছিল সিসকো।