সাভার-আশুলিয়ায় কারখানায় ফিরতে শুরু করেছেন শ্রমিকরা, মজুরি বোর্ড গঠনে স্বস্তি
ন্যূনতম মজুরি বৃদ্ধি ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধার দাবিতে চলমান শ্রমিক অসন্তোষের মধ্যে সরকার মজুরি বোর্ড গঠনের সিদ্ধান্ত নেওয়ায় কাজে ফিরতে শুরু করেছেন সাভার-আশুলিয়ার শিল্পাঞ্চলের বিভিন্ন কারখানায় শ্রমিকরা। এতে শিল্পাঞ্চলে অস্থিরতা নিরসনের আশা তৈরি হয়েছে।
আজ সোমবার শিল্পাঞ্চলের বিভিন্ন কারখানায় শ্রমিকদের শান্তিপূর্ণভাবে প্রবেশ করতে এবং কাজে যোগ দিতে দেখা গেছে।
এর আগে রোববার শ্রমিকনেতা ও তৈরি পোশাকশিল্পের মালিকপক্ষের প্রতিনিধিদের সঙ্গে আলোচনার পর তৈরি পোশাক খাতের শ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণে ছয় সদস্যের মজুরি বোর্ড গঠন করে সরকার।
এদিকে শ্রমিকনেতারা তাদের ন্যায্য মজুরির দাবি নবগঠিত বোর্ডের মাধ্যমে আদায়ের উদ্যোগ নিতে শ্রমিকদের কাজে যোগ দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।
আজ রাজধানীর বিজয়নগরে শ্রম ভবনে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে মজুরি বোর্ডের শ্রমিক প্রতিনিধি এবং বাংলাদেশ গার্মেন্টস অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিয়াল ওয়ার্কার্স ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক বাবুল আখতার শ্রমিকদের কাজে ফেরার আহ্বান জানান।
তিনি বলেন, শ্রমিকদের ন্যায্য মজুরি নিশ্চিত করতে তাদের প্রতিনিধিরা লড়াই চালিয়ে যাবেন।
বাবুল আখতার বলেন, ‘আপনারা কারখানায় ফিরে কাজে যোগ দিন। আপনাদের ন্যায্য মজুরির জন্য আমরা লড়াই করব। প্রয়োজনে আন্দোলনে যোগ দেওয়ার জন্য আপনাদের আবারও ডাকব।’
আগামী বছরের জানুয়ারি থেকে শ্রমিকদের বর্ধিত মজুরি নিশ্চিতে মজুরি বোর্ড কাজ করবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।
বাংলাদেশ গার্মেন্টস অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিয়াল ওয়ার্কার্স ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক আরও বলেন, সংশোধিত মজুরি কাঠামো বাস্তবায়নে অযথা বিলম্বের কোনো কারণ নেই।
প্রস্তাবিত মজুরি নিয়ে সম্মিলিত অবস্থান তৈরির আগে বিভিন্ন শ্রমিক ফেডারেশন, কারখানাভিত্তিক ট্রেড ইউনিয়ন এবং সাধারণ শ্রমিকদের সঙ্গে আলোচনা করা হবে বলেও জানান তিনি।
বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দলের সভাপতি আনোয়ার হোসেন বলেন, চলমান আন্দোলনে শ্রমিকদের কোনো লাভ হচ্ছে না, বরং তাদের ন্যায্য দাবিগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
আওয়াজ ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক নাজমা আখতার বলেন, চলমান পরিস্থিতির কারণে কারখানার মালিকেরা কাজের আদেশ হারাচ্ছেন। শ্রমিকদের আন্দোলনে কোনো স্বার্থান্বেষী মহল অনুপ্রবেশ করেছে কি না, তা তদন্ত করতে তিনি সরকারের প্রতি আহ্বান জানান।
এর আগে বিভিন্ন শ্রমিক সংগঠনের নেতারা মজুরি বোর্ড গঠনের সরকারি উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়ে একে শ্রমিকদের স্বার্থ সুরক্ষায় ইতিবাচক পদক্ষেপ হিসেবে অভিহিত করেন।
বাসসের সঙ্গে আলাপকালে সম্মিলিত গার্মেন্টস শ্রমিক ফেডারেশনের সভাপতি নাজমা আক্তার বলেন, মজুরি বোর্ড গঠনের উদ্যোগ সময়োপযোগী। তিনি এ উদ্যোগের জন্য সরকারকে ধন্যবাদ জানান।
শিল্পপ্রতিষ্ঠানে হামলা, ভাঙচুর ও নাশকতার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের চিহ্নিত করে শাস্তির আওতায় আনারও দাবি জানান তিনি।
বাংলাদেশ গার্মেন্টস শ্রমিক সংহতির সভাপতি তাসলিমা আখতার বলেন, পাঁচ বছরের পরিবর্তে প্রতি তিন বছর পরপর মজুরি পর্যালোচনার বিধান শ্রমিকদের ক্রয়ক্ষমতা সুরক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। শ্রমিক অসন্তোষ এড়ানো এবং কারখানার নিরাপত্তা নিশ্চিতে শান্তিপূর্ণ আলোচনার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।
বাংলাদেশ গার্মেন্টস, টেক্সটাইল অ্যান্ড লেদার ওয়ার্কার্স ফেডারেশনের সভাপতি কুতুবউদ্দিন আহমেদ বলেন, তাদের সংগঠন মাসিক ন্যূনতম মজুরি ২৬০ মার্কিন ডলার নির্ধারণের প্রস্তাব দিয়েছে। শ্রমিক, মালিক ও সরকারের মধ্যে আলোচনার মাধ্যমে এ বিষয়ে ঐকমত্যে পৌঁছানো সম্ভব হবে বলেও তিনি আশা প্রকাশ করেন।
ইন্ডাস্ট্রিয়াল বাংলাদেশ কাউন্সিলের সাধারণ সম্পাদক সালাউদ্দিন স্বপনও মজুরি বোর্ড গঠনের উদ্যোগকে স্বাগত জানান। অযথা বিলম্ব না করে নতুন মজুরি চূড়ান্ত করতে ঘন ঘন বৈঠক আয়োজনের আহ্বান জানান তিনি। একই সঙ্গে কারখানায় ট্রেড ইউনিয়নের কার্যক্রম সম্প্রসারণ এবং শ্রমিকদের কালো তালিকাভুক্ত করার মতো সমস্যা সমাধানের ওপর গুরুত্ব দেন।
এর আগে গতকাল সচিবালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী ছয় সদস্যের মজুরি বোর্ড গঠনের ঘোষণা দেন।
বোর্ডের চেয়ারম্যান করা হয়েছে সিনিয়র জেলা ও দায়রা জজ শেখ আশফাকুর রহমানকে। অন্য সদস্যরা হলেন- মালিকপক্ষের প্রতিনিধি হিসেবে বিজিএমই-এর পরিচালক এ বি এম শামসুদ্দিন, শ্রমিকপক্ষের প্রতিনিধি হিসেবে বাংলাদেশ গার্মেন্টস অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিয়াল ওয়ার্কার্স ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক বাবুল আখতার, বাংলাদেশ এমপ্লয়ার্স ফেডারেশনের যুগ্ম মহাসচিব আসিফ আইয়ুব এবং স্বতন্ত্র সদস্য মোসলেহ উদ্দিন আহমেদ ও আনোয়ার হোসেন।
বোর্ডটি তৈরি পোশাকশিল্পের বিভিন্ন গ্রেডের শ্রমিকদের জন্য ন্যূনতম মজুরি সুপারিশ করবে। বোর্ডের সুপারিশের ভিত্তিতে সরকার নতুন মজুরি কাঠামো নির্ধারণ করে প্রজ্ঞাপন জারি করবে।
সর্বশেষ ২০২৩ সালের ডিসেম্বরে পোশাক শ্রমিকদের ন্যূনতম মাসিক মজুরি ১২ হাজার ৫০০ টাকা নির্ধারণ করা হয়।
শ্রমিকনেতারা বলেন, মজুরি বোর্ড গঠনের মধ্য দিয়ে শ্রমিকদের দাবিদাওয়া নিষ্পত্তির একটি প্রাতিষ্ঠানিক সুযোগ তৈরি হয়েছে। তারা সংঘাত, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের পরিবর্তে শান্তিপূর্ণ কর্মসূচি ও আলোচনার মাধ্যমে সমস্যা সমাধানের আহ্বান জানান।
শ্রমিকদের জীবিকা ও জাতীয় অর্থনীতির স্বার্থে শিল্পপ্রতিষ্ঠানের নিরাপত্তা নিশ্চিত করাও জরুরি বলে তারা উল্লেখ করেন।
শ্রমিকদের কারখানায় ফিরে যাওয়া এবং শ্রমিকনেতাদের আলোচনার মাধ্যমে দাবি আদায়ের আহ্বানে শিল্পাঞ্চলে স্বাভাবিক পরিবেশ ফিরে আসার আশা তৈরি হয়েছে।
শিল্পখাতে দীর্ঘমেয়াদি শান্তি ও স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে সময়মতো মজুরি আলোচনা, শ্রমিক অধিকার সুরক্ষা এবং সরকার, মালিক ও শ্রমিক প্রতিনিধিদের পারস্পরিক সহযোগিতা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।