Favicon

ছয় বছরে গীতিকবি সংঘ: অধিকার আদায় থেকে সৃষ্টিকর্ম সংরক্ষণ

প্রতিবেদক: রেজাউর রহমান রিজভী অক্টোবর ২৭, ২০২৬, ৪:৫৭ অপরাহ্ণ বিভাগ: মতামত
ছয় বছরে গীতিকবি সংঘ: অধিকার আদায় থেকে সৃষ্টিকর্ম সংরক্ষণ
ছবি : সংগৃহীত
কপিরাইট আইন সংশোধনের দাবি, রয়্যালটি আদায়ে উদ্যোগ, অসুস্থ গীতিকবিদের সহায়তা এবং ১২৯ গীতিকবির গান নিয়ে সংকলন প্রকাশ—বিভিন্ন কার্যক্রমের মধ্য দিয়ে ছয় বছর পার করেছে গীতিকবি সংঘ বাংলাদেশ।

বাংলা গানের অন্যতম প্রধান স্রষ্টা গীতিকবি। তাঁদের লেখা গানের সুর ও কণ্ঠ মানুষের মুখে মুখে ফিরলেও গানের স্বত্ব, রয়্যালটি ও প্রাপ্য স্বীকৃতির প্রশ্ন দীর্ঘদিন ধরেই আলোচনায় রয়েছে। গীতিকবিদের অধিকার, মর্যাদা ও কল্যাণ নিশ্চিত করার লক্ষ্য নিয়ে ২০২০ সালে যাত্রা শুরু করে গীতিকবি সংঘ বাংলাদেশ। ছয় বছরে কপিরাইট আইন সংশোধনের দাবি, রয়্যালটি নিয়ে অভিযোগের নিষ্পত্তিতে উদ্যোগ, গীতিকবিদের সৃষ্টিকর্ম সংরক্ষণ, সম্মাননা ও চিকিৎসা সহায়তার মতো নানা কার্যক্রম পরিচালনা করেছে সংগঠনটি।

সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সংগঠনটির কার্যক্রম ও অর্জন নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। এর পরিপ্রেক্ষিতে প্রতিষ্ঠাকাল থেকে ২০২৬ সালের অক্টোবর পর্যন্ত বিভিন্ন উদ্যোগের বিবরণ তুলে ধরেছেন সংঘের সাংগঠনিক সম্পাদক ও গীতিকবি সিরাজুম মুনির। সংগঠনটির সঙ্গে চার বছরের ঘনিষ্ঠ সম্পৃক্ততার অভিজ্ঞতা থেকে তিনি মনে করেন, ছয় বছরের কার্যক্রম বিস্তারিতভাবে তুলে ধরতে গেলে ‘সংঘজনের গীতিকবিতা’র মতো আরেকটি বই প্রকাশ করা সম্ভব।

তবে সংগঠনটির অর্জনের পাশাপাশি গীতিকবিদের ন্যায্য রয়্যালটি, কপিরাইটের কার্যকর প্রয়োগ ও পেশাগত স্বীকৃতি নিশ্চিত করার চ্যালেঞ্জও রয়ে গেছে।

যেভাবে শুরু হয়েছিল যাত্রা

২০২০ সালের ৩ জুলাই বিভিন্ন প্রজন্মের গীতিকবিদের অংশগ্রহণে প্রথম সাংগঠনিক বৈঠকের মধ্য দিয়ে গীতিকবি সংঘ বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার প্রক্রিয়া শুরু হয়। একই বছরের ২৪ জুলাই আনুষ্ঠানিকভাবে আত্মপ্রকাশ করে সংগঠনটি।

অর্ধশতাধিক গীতিকবির মতামতের ভিত্তিতে সংগঠনের নাম, গঠনতন্ত্র ও সমন্বয় কমিটি চূড়ান্ত করা হয়। প্রবীণ গীতিকবি গাজী মাজহারুল আনোয়ার, মোহাম্মদ রফিকউজ্জামান ও মনিরুজ্জামান মনিরসহ বরেণ্য গীতিকবিদের সমর্থন ও অংশগ্রহণে গড়ে ওঠে এর সাংগঠনিক ভিত্তি।

পরবর্তী সময়ে কার্যনির্বাহী কমিটি গঠন, নির্বাচন, সাধারণ সভা এবং সদস্যপদ সম্প্রসারণের মাধ্যমে সংগঠনটির কার্যক্রম বিস্তৃত হয়। বিভিন্ন প্রজন্মের গীতিকবিদের একই প্ল্যাটফর্মে আনা এবং তাঁদের পেশাগত স্বার্থ নিয়ে সম্মিলিতভাবে কাজ করাই হয়ে ওঠে সংঘের অন্যতম লক্ষ্য।

কপিরাইট আইন সংশোধনের দাবি

প্রতিষ্ঠার প্রথম মাস থেকেই গীতিকবিদের কপিরাইট ও সৃষ্টিকর্মের অধিকার নিয়ে সরকারি পর্যায়ে আলোচনা শুরু করে সংগঠনটি।

২০২০ সালের ১৪ আগস্ট বাংলাদেশ কপিরাইট অফিসের তৎকালীন রেজিস্ট্রার ও যুগ্ম সচিব জাফর রাজা চৌধুরীর সঙ্গে প্রায় তিন ঘণ্টা বৈঠক করেন সংঘের প্রতিনিধিরা। এতে গাজী মাজহারুল আনোয়ার, মোহাম্মদ রফিকউজ্জামান ও মনিরুজ্জামান মনিরসহ অন্য গীতিকবিরা অংশ নেন। বৈঠকে প্রস্তাবিত কপিরাইট আইনে গীতিকবিদের স্বার্থ সংরক্ষণ, গানের মৌলিক স্রষ্টাদের অধিকার এবং বিদ্যমান আইনগত জটিলতা নিরসনের বিষয়গুলো গুরুত্ব পায়। একই মাসে আইন সংশোধনের দাবিতে সংশ্লিষ্ট দপ্তরে চিঠিও দেওয়া হয়।

সংগঠনটির দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২১ সালে কপিরাইট আইন সংশোধন নিয়ে অংশীজনদের আলোচনায় গীতিকার ও সুরকারকে যৌথভাবে গানের প্রণেতা হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার বিষয়ে ঐকমত্য হয়েছিল। কিন্তু পরবর্তী সময়ে সংশোধিত আইনের খসড়ায় গীতিকারদের স্বীকৃতি বাদ পড়ায় উদ্বেগ তৈরি হয়।

এ নিয়ে ২০২৩ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি জাতীয় সংসদের সংশ্লিষ্ট স্থায়ী কমিটির তৎকালীন সভাপতি সিমিন হোসেন রিমির কাছে বিষয়টি তুলে ধরার উদ্যোগ নেয় সংঘ। গীতিকবিদের মতে, তাঁদের সৃষ্টিকর্মের মালিকানা, কপিরাইট ও ন্যায্য রয়্যালটি নিশ্চিত করতে আইনি স্বীকৃতি গুরুত্বপূর্ণ।

রয়্যালটি নিয়ে অভিযোগে উদ্যোগ

গানের রয়্যালটি বা মেধাস্বত্ব থেকে প্রাপ্য অর্থের হিসাব নিয়ে অভিযোগ উঠলে সংশ্লিষ্ট গীতিকবির পাশে দাঁড়ানোর উদ্যোগও নিয়েছে সংগঠনটি।

২০২৬ সালের অক্টোবরে একজন গীতিকবি রয়্যালটির হিসাব নিয়ে অভিযোগ করলে সংশ্লিষ্ট রয়্যালটি ব্যবস্থাপনা প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠক করেন সংঘের নেতারা। সংগঠনটির বিবরণ অনুযায়ী, আলোচনার পর হিসাব পুনরায় প্রদান ও যাচাইয়ের ব্যবস্থা নেওয়া হয়।

গীতিকবিদের সৃষ্টিকর্ম থেকে আয় হলেও তাঁরা কতটা ন্যায্য পারিশ্রমিক পাচ্ছেন, সে প্রশ্ন বাংলা গানের জগতে গুরুত্বপূর্ণ। এ ক্ষেত্রে অভিযোগ যাচাই, স্বচ্ছ হিসাব এবং রয়্যালটি বণ্টনের কার্যকর ব্যবস্থা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। সংঘের সাম্প্রতিক উদ্যোগটি সেই আলোচনাকে আবার সামনে এনেছে।

কপিরাইট বিষয়ে সচেতনতা

আইনগত অধিকার সম্পর্কে গীতিকবিদের সচেতন করতে ২০২৬ সালের ১৭ অক্টোবর রাজধানীর আগারগাঁওয়ে বাংলাদেশ কপিরাইট অফিসের সহযোগিতায় কর্মশালার আয়োজন করে সংঘ।

কর্মশালায় কপিরাইট নিবন্ধন, সৃষ্টিকর্মের স্বত্ব সংরক্ষণ, গীতিকবিদের আইনগত অধিকার ও সংশ্লিষ্ট জটিলতা নিয়ে আলোচনা হয়। ছিল প্রশ্নোত্তর পর্বও। সংগঠনটির সদস্যদের পাশাপাশি দেশের সব গীতিকবির জন্য কর্মশালাটি উন্মুক্ত রাখা হয়েছিল।

কপিরাইট সম্পর্কে সচেতনতা বাড়ানোর পাশাপাশি সৃষ্টিকর্মের মালিকানা প্রতিষ্ঠা এবং রয়্যালটি আদায়ের প্রক্রিয়া সম্পর্কে বাস্তব ধারণা দেওয়ার ক্ষেত্রে এ ধরনের আয়োজন ভূমিকা রাখতে পারে।

কিংবদন্তি গীতিকবিদের স্মৃতি সংরক্ষণ

বাংলা গানের ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ স্রষ্টাদের জীবন ও কর্ম সংরক্ষণেও উদ্যোগ নিয়েছে গীতিকবি সংঘ বাংলাদেশ।

কিংবদন্তি গীতিকবি গাজী মাজহারুল আনোয়ারের স্মৃতি ও অবদান তুলে ধরতে ২০২২ সালের ১২ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির সঙ্গে যৌথভাবে স্মরণসভার আয়োজন করে সংগঠনটি। এতে প্রধান অতিথি ছিলেন তৎকালীন তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদ। অনুষ্ঠানে গাজী মাজহারুল আনোয়ারের জীবন ও কর্ম নিয়ে প্রামাণ্যচিত্র প্রদর্শন করা হয়। তাঁর কালজয়ী গান সংরক্ষণ এবং তাঁর নামে স্থাপনা বা সড়কের নামকরণের দাবিও তোলা হয়।

এর বাইরে ২০২৪ সালের ২০ জানুয়ারি প্রয়াত কবি ও গীতিকবি জাহিদুল হকের স্মরণে বিশেষ সভার আয়োজন করা হয়। প্রয়াত গীতিকবি কে জি মোস্তফা, কাওসার আহমেদ চৌধুরী, ওমর ফারুক বিশাল ও বর্ণ চক্রবর্তীর মতো স্রষ্টাদের অবদান স্মরণ এবং তাঁদের সৃষ্টিকর্ম সংরক্ষণের প্রয়োজনীয়তাও সংগঠনটির বিভিন্ন আলোচনায় উঠে এসেছে।

গীতিকবিদের কাজের যথাযথ সংরক্ষণ শুধু তাঁদের স্মৃতি ধরে রাখার বিষয় নয়; এটি বাংলা গানের ইতিহাস ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেওয়ারও অংশ।

‘গীতিকবি আড্ডা’য় সৃষ্টির গল্প

প্রবীণ গীতিকবিদের সম্মান জানানো এবং তাঁদের সৃষ্টিশীল অভিজ্ঞতা নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরতে ‘গীতিকবি আড্ডা’ নামে একটি আয়োজন শুরু করেছে সংঘ।

২০২০ সালের শেষ দিকে সংগঠনের নেতারা আজীবন সদস্যদের বাড়িতে গিয়ে ছবিসংবলিত বিশেষ শুভেচ্ছাপত্র পৌঁছে দেন। পরে ২০২৫ সালের ১০ মে রাজধানীর বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রে ‘গীতিকবি আড্ডা’র প্রথম পর্ব অনুষ্ঠিত হয়। এতে আধুনিক বাংলা গানের তিন বিশিষ্ট গীতিকবি শহীদ মাহমুদ জঙ্গী, লিটন অধিকারী রিন্টু ও গোলাম মোর্শেদকে সম্মাননা জানানো হয়।

২০২৬ সালের ১১ জুলাই অনুষ্ঠিত দ্বিতীয় পর্বে অতিথি ছিলেন গীতিকবি শহীদুল্লাহ ফরায়জী ও তরুণ মুন্সী। এসব আয়োজনে গীতিকবিদের গান লেখার অভিজ্ঞতা, সৃষ্টিশীল জীবন, শিল্পদর্শন এবং বাংলা সংগীতে তাঁদের অবদানের কথা উঠে আসে।

এ ধরনের আয়োজনের মধ্য দিয়ে প্রবীণ ও নবীন গীতিকবিদের মধ্যে অভিজ্ঞতা বিনিময়ের সুযোগ তৈরি হচ্ছে। একই সঙ্গে গানের পেছনে থাকা স্রষ্টাদের পরিচয় ও অবদান শ্রোতাদের কাছে তুলে ধরার ক্ষেত্রও তৈরি হচ্ছে।

১২৯ গীতিকবির সৃষ্টিকর্ম নিয়ে বই

গীতিকবি সংঘ বাংলাদেশের উল্লেখযোগ্য উদ্যোগগুলোর একটি ‘সংঘজনের গীতিকবিতা’ গ্রন্থ প্রকাশ। সংঘ ও অ্যাডর্ন পাবলিকেশন্সের যৌথ উদ্যোগে প্রকাশিত বইটির মোড়ক উন্মোচন হয় ২০২৪ সালের ২৯ নভেম্বর বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রে।

গ্রন্থটিতে প্রবীণ থেকে নবীন ১২৯ জন গীতিকবির সংক্ষিপ্ত জীবনী, আলোকচিত্র, প্রত্যেকের নির্বাচিত ১০টি গানের তালিকা এবং একটি করে পূর্ণাঙ্গ গীতিকবিতা স্থান পেয়েছে। অর্থাৎ, বইটিতে প্রায় ১ হাজার ৩০০টি নির্বাচিত গানের তথ্যের পাশাপাশি সংরক্ষিত হয়েছে ১২৯টি পূর্ণাঙ্গ গীতিকবিতা।

সদস্যদের সঙ্গে যোগাযোগ, লেখা সংগ্রহ, তথ্য যাচাই, সম্পাদনা এবং প্রকাশকের সঙ্গে সমন্বয়ের মধ্য দিয়ে সম্পন্ন হয় প্রকাশনার কাজটি।

বাংলা গানের ইতিহাসে কণ্ঠশিল্পী ও সুরকারদের পরিচিতি তুলনামূলকভাবে বেশি দৃশ্যমান হলেও অনেক গীতিকবির জীবন ও সৃষ্টিকর্মের তথ্য সহজে পাওয়া যায় না। সে বিবেচনায় সংকলনটি গীতিকবিদের পরিচিতি ও তাঁদের সৃষ্টিকর্ম সংরক্ষণের একটি উদ্যোগ হিসেবে গুরুত্ব পেয়েছে।

অসুস্থ গীতিকবিদের পাশে

সাংস্কৃতিক ও সাংগঠনিক কার্যক্রমের পাশাপাশি অসুস্থ এবং আর্থিক সংকটে থাকা গীতিকবিদের সহায়তায়ও কাজ করেছে সংঘ।

সংগঠনটির দেওয়া হিসাব অনুযায়ী, ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে গীতিকবিদের জন্য মোট ৫৩ হাজার টাকা আর্থিক সহায়তা দেওয়া হয়। এরপর ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বর ও অক্টোবরে অস্ত্রোপচার-পরবর্তী আর্থিক সংকটে থাকা একজন গীতিকবির চিকিৎসার জন্য সদস্যদের উদ্যোগে অর্থ সংগ্রহ করা হয়। অক্টোবরের শুরু পর্যন্ত সংগৃহীত ২২ হাজার টাকা তাঁর হাতে পৌঁছে দেওয়া হয়।

এই দুটি উদ্যোগে মোট ৭৫ হাজার টাকার সহায়তার তথ্য পাওয়া যায়। এর বাইরেও বিভিন্ন সময়ে অসুস্থ ও বিপদগ্রস্ত গীতিকবিদের পাশে দাঁড়ানোর কথা জানিয়েছে সংগঠনটি। সহায়তাপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের পরিচয় তাঁদের গোপনীয়তা রক্ষার স্বার্থে প্রকাশ করা হয়নি।

২০২৪ সালের ৩১ ডিসেম্বর ইউনিভার্সেল মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সঙ্গে করপোরেট স্বাস্থ্যসেবা চুক্তিও স্বাক্ষর করে সংঘ। এর আওতায় সদস্য ও তাঁদের পরিবারের জন্য বিভিন্ন স্বাস্থ্য পরীক্ষা, এক্সিকিউটিভ হেলথ চেকআপ, কার্ডিয়াক চেকআপ এবং নির্ধারিত চিকিৎসাসেবায় বিশেষ ছাড়ের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।

পুরস্কারে পৃথক স্বীকৃতির দাবি

একটি গানের জনপ্রিয়তার পেছনে কণ্ঠশিল্পীর পাশাপাশি গীতিকবি ও সুরকারেরও মৌলিক অবদান থাকে। এই অবদানকে স্বতন্ত্রভাবে স্বীকৃতি দেওয়ার দাবি তুলেছে গীতিকবি সংঘ বাংলাদেশ।

সংগঠনটির উদ্যোগে ২০২৪ সালে মেরিল-প্রথম আলো পুরস্কারে গীতিকবি ও সুরকারদের জন্য পৃথক বিভাগ চালুর বিষয়ে আনুষ্ঠানিক প্রস্তাবনা প্রস্তুত করা হয়। সংঘের যুক্তি, গানের সৃষ্টিপ্রক্রিয়ায় প্রত্যেকের অবদান আলাদা; তাই পুরস্কার ও সম্মাননার ক্ষেত্রেও সেই স্বাতন্ত্র্য প্রতিফলিত হওয়া প্রয়োজন।

গানের স্বীকৃতি ও পুরস্কার নিয়ে আলোচনায় গীতিকবি ও সুরকারদের অবস্থান আরও দৃশ্যমান করার ক্ষেত্রে এ দাবি তাৎপর্যপূর্ণ।

ওয়েবসাইট ও সাংগঠনিক কার্যক্রম

ডিজিটাল মাধ্যমে সদস্যদের পরিচিতি ও সংগঠনের কার্যক্রম সংরক্ষণে ২০২৫ সালের ২১ মার্চ বার্ষিক সাধারণ সভায় সংঘের নিজস্ব ওয়েবসাইট উদ্বোধন করা হয়। ওয়েবসাইটে সদস্যদের প্রোফাইল, সংগঠনের পরিচিতি এবং বিভিন্ন কার্যক্রমের তথ্য প্রকাশের ব্যবস্থা রয়েছে।

নেতৃত্ব নির্বাচন ও সাংগঠনিক জবাবদিহির ক্ষেত্রেও নিয়মিত কার্যক্রম পরিচালনার কথা জানিয়েছে সংঘ। ২০২১-২০২২ মেয়াদের প্রথম কার্যনির্বাহী কমিটি গঠনের পর ২০২২ সালের ২৯ জুলাই বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমিতে ভোটগ্রহণের মাধ্যমে নির্বাচিত কমিটি গঠন করা হয়। ২০২৪ সালের ২৯ নভেম্বর বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রে পরবর্তী মেয়াদের ১৫ সদস্যের কার্যনির্বাহী কমিটির নির্বাচনী ফল ঘোষণা, শপথ ও দায়িত্ব হস্তান্তর সম্পন্ন হয়।

২০২৩ সালে ১১ জন নতুন গীতিকবিকে সদস্যপদ দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়। পরবর্তী সময়েও নতুন ও তরুণ গীতিকবিদের অন্তর্ভুক্তির কার্যক্রম অব্যাহত থাকে। ২০২৫ সালের ২১ মার্চের বার্ষিক সাধারণ সভায় সাংগঠনিক ও আর্থিক প্রতিবেদন উপস্থাপন করা হয় এবং নতুন সদস্যদের পরিচয় করিয়ে দেওয়া হয়।

অর্জন আছে, চ্যালেঞ্জও রয়ে গেছে

ছয় বছরের কার্যক্রমে সংগঠনটি কপিরাইট, রয়্যালটি, সৃষ্টিকর্ম সংরক্ষণ, সম্মাননা ও সদস্যকল্যাণের মতো বিভিন্ন বিষয়ে কাজ করেছে। তবে এসব উদ্যোগের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব কতটা বিস্তৃত হয়েছে, তা মূল্যায়নের জন্য নিয়মিত অগ্রগতি, রয়্যালটি নিষ্পত্তির ফলাফল এবং সদস্যকল্যাণ কার্যক্রমের বিস্তারিত তথ্যও গুরুত্বপূর্ণ।

গীতিকবিদের ন্যায্য রয়্যালটি নিশ্চিত করা, কপিরাইট আইনের কার্যকর প্রয়োগ, মৌলিক স্রষ্টাদের যথাযথ সম্মানী এবং পেশাগত নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে এখনো কাজের সুযোগ রয়েছে। সংগঠনটির সামনে বড় চ্যালেঞ্জ হলো বিচ্ছিন্ন উদ্যোগগুলোকে দীর্ঘমেয়াদি ও কার্যকর ব্যবস্থায় রূপ দেওয়া।

সিরাজুম মুনিরের ভাষায়, “কাজ বাকি থাকা আর কোনো কাজই হয়নি, এই দুটি সম্পূর্ণ ভিন্ন বিষয়।”

সংগঠনের সমালোচনার অধিকার সবার আছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, সমালোচনা হওয়া উচিত তথ্য, ইতিহাস ও বাস্তব অবদানের যথাযথ মূল্যায়নের ভিত্তিতে। তাঁর মতে, একটি স্বেচ্ছাসেবী সাংস্কৃতিক সংগঠনের সাফল্য শুধু কতটি অনুষ্ঠান আয়োজন করেছে, তা দিয়ে বিচার করা যায় না। আইনি দাবি তোলা, অসুস্থ সহকর্মীর পাশে দাঁড়ানো, প্রবীণ স্রষ্টাকে সম্মান জানানো কিংবা শতাধিক গীতিকবির সৃষ্টিকর্ম সংরক্ষণ করাও গুরুত্বপূর্ণ অবদান।

প্রতিষ্ঠার ছয় বছরে গীতিকবি সংঘ বাংলাদেশের কার্যক্রমে অধিকার আদায়ের চেষ্টা, সাংগঠনিক ঐক্য, সৃষ্টিকর্ম সংরক্ষণ ও সদস্যকল্যাণের বিভিন্ন দিক উঠে এসেছে। এসব উদ্যোগ কতটা স্থায়ী পরিবর্তন আনতে পারে, তা নির্ভর করবে ভবিষ্যতে গীতিকবিদের অধিকার প্রতিষ্ঠা, রয়্যালটি ব্যবস্থার স্বচ্ছতা এবং সৃষ্টিকর্ম সংরক্ষণের ধারাবাহিকতার ওপর।

বাংলা গানের মূল স্রষ্টাদের যথাযথ স্বীকৃতি নিশ্চিত করার যে লক্ষ্য নিয়ে সংগঠনটির যাত্রা শুরু হয়েছিল, ছয় বছর পর সেই লক্ষ্যই তার পরবর্তী পথচলার প্রধান মাপকাঠি হয়ে রয়েছে।