Favicon

ভক্তি যখন এক নৃত্যশিল্পীর শরীরে জীবন্ত হয়ে ওঠে

প্রতিবেদক: রুমা চৌধুরী সেপ্টেম্বর ৬, ২০২৬, ৪:৪৫ অপরাহ্ণ বিভাগ: সংস্কৃতি
ভক্তি যখন এক নৃত্যশিল্পীর শরীরে জীবন্ত হয়ে ওঠে
গত ৫ সেপ্টেম্বর লন্ডনের রিভারসাইড স্টুডিওতে ভারতনাট্যম শিল্পী রাধে জাগ্গির একক পরিবেশনা ‘BHAKTA’ (ভক্ত) এর আয়োজন করা হয়।
লন্ডনে রাধে জাগ্গির একক ভারতনাট্যম পরিবেশনা ‘BHAKTA’

পাঁচটি পরিবেশনা। একজন নৃত্যশিল্পী। অথচ পুরো সন্ধ্যাজুড়ে মনে হলো, মঞ্চে তিনি একা নন—তাঁর শরীর, দৃষ্টি, মুদ্রা ও অভিব্যক্তির মধ্য দিয়ে যেন একের পর এক চরিত্র এবং ভক্তির নানা রূপ জীবন্ত হয়ে উঠছে।

গত ৫ সেপ্টেম্বর লন্ডনের রিভারসাইড স্টুডিওতে ভারতনাট্যম শিল্পী রাধে জাগ্গির একক পরিবেশনা ‘BHAKTA’ (ভক্ত) দেখার সুযোগ হয়েছিল আমার। চলতি বছর যুক্তরাজ্যে এটিই ছিল তাঁর একমাত্র পরিবেশনা।

বাংলাদেশের দর্শকদের কাছে রাধে জাগ্গি হয়তো এখনো খুব পরিচিত নাম নন। তবে ভারতীয় শাস্ত্রীয় নৃত্যের জগতে তাঁর পথচলা দীর্ঘদিনের। প্রখ্যাত ভারতনাট্যম শিল্পী লীলা স্যামসনের শিষ্য রাধে চেন্নাইয়ের ঐতিহ্যবাহী Kalakshetra Foundation-এ প্রশিক্ষণ নিয়েছেন। তামিলনাড়ুর বিভিন্ন মন্দিরে নৃত্য পরিবেশনের মধ্য দিয়ে তাঁর শিল্পযাত্রার সূচনা। পরে সেই যাত্রা ভারত ছাড়িয়ে পৌঁছেছে বিশ্বের বিভিন্ন আন্তর্জাতিক মঞ্চে।

বর্তমানে তিনি Project Samskriti-এর নেতৃত্ব দিচ্ছেন, যার অন্যতম লক্ষ্য ভারতীয় শাস্ত্রীয় শিল্পকলার ঐতিহ্য সংরক্ষণ, পুনরুজ্জীবন এবং নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেওয়া।

রাধে জাগ্গির আরেকটি পরিচয়ও রয়েছে—তিনি ভারতীয় যোগী ও আধ্যাত্মিক গুরু সদগুরুর কন্যা। তবে রিভারসাইড স্টুডিওর মঞ্চে তাঁর পরিচয়ের সবচেয়ে উজ্জ্বল দিকটি ছিল একজন স্বতন্ত্র ভারতনাট্যম শিল্পী হিসেবে তাঁর উপস্থিতি। সেখানে তিনি কারও কন্যা হিসেবে নয়, বরং নিজের সাধনা, প্রশিক্ষণ ও শিল্পভাষায় প্রতিষ্ঠিত একজন নৃত্যশিল্পী হিসেবেই দর্শকের সামনে দাঁড়িয়েছেন।

একজন মানুষ কতটা নিজেকে সমর্পণ করতে পারেন—ঈশ্বরের কাছে, গুরুর কাছে, ভালোবাসার কাছে, কোনো আদর্শের কাছে কিংবা জীবনের কাছেই?

একজন শিল্পী, অথচ বহু চরিত্র

রাধে জাগ্গির সবচেয়ে বড় শক্তিগুলোর একটি হলো এককভাবে পুরো মঞ্চকে ধারণ করার ক্ষমতা।

মঞ্চে একজন মানুষ। অথচ মুহূর্তেই বদলে যাচ্ছেন চরিত্র। বদলে যাচ্ছে দৃষ্টি, মুখের অভিব্যক্তি, শরীরের ভঙ্গি। একটি হাতের মুদ্রা, মাথার সামান্য ঘোরানো কিংবা শরীরের সূক্ষ্ম একটি পরিবর্তনই যথেষ্ট—দর্শকের চোখের সামনে তৈরি হচ্ছে নতুন একটি চরিত্র।

ভারতনাট্যমের মুদ্রা, দৃষ্টি, শরীরী ভাষা, ছন্দ ও অভিনয়ের সমন্বয়ে রাধে একের পর এক চরিত্রকে জীবন্ত করে তুলছিলেন। ফলে একসময় মনে হচ্ছিল, মঞ্চে তিনি একা নন; বরং একাই যেন হয়ে উঠেছেন একটি সম্পূর্ণ জগৎ।

প্রতিটি পরিবেশনার আগে রাধে নিজেই দর্শকদের সঙ্গে কথা বলেছেন এবং গল্পের প্রেক্ষাপট তুলে ধরেছেন। তাঁর কণ্ঠ, হাতের স্বতঃস্ফূর্ত অভিব্যক্তি এবং সহজ গল্প বলার ভঙ্গি শুরুতেই দর্শকের সঙ্গে একটি ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ তৈরি করেছিল।

একসময় মনে হচ্ছিল, শিল্পী ও দর্শকের মধ্যকার দূরত্বটুকুও আর নেই। আমরা যেন তাঁর গল্পের ভেতরে প্রবেশ করছি, আর তিনি পৌঁছে যাচ্ছেন আমাদের অনুভবের গভীরে।

পাঁচ পরিবেশনায় ভক্তির নানা রূপ

‘BHAKTA’ সন্ধ্যায় ছিল পাঁচটি পরিবেশনা—‘Amba Neelambari’, লীলা স্যামসনের কোরিওগ্রাফি; ‘Auchitya’, মৃত্যু নিয়ে রাধে জাগ্গির নিজস্ব কোরিওগ্রাফি; ‘Dari Juchuchunadi’, ঐতিহ্যবাহী নৃত্যশিল্পী মাইলাপোর গৌরী আম্মালের সঙ্গে সম্পর্কিত একটি ঐতিহ্যবাহী পরিবেশনা; ‘Alakh Niranjan’, এক পরিব্রাজক সাধুর কাহিনি অবলম্বনে রাধের কোরিওগ্রাফি; এবং ‘Madhuvanti Tillana’, লীলা স্যামসনের কোরিওগ্রাফি।

পাঁচটি পরিবেশনার মধ্য দিয়ে বিশেষভাবে যে বিষয়টি চোখে পড়ে, তা হলো—ঐতিহ্য ও নতুন সৃষ্টির মেলবন্ধন।

কোথাও গুরু-পরম্পরার কোরিওগ্রাফি বহন করছেন শিষ্য, কোথাও উঠে এসেছে বহু পুরোনো নৃত্যঐতিহ্য, আবার কোথাও প্রকাশ পেয়েছে রাধের নিজস্ব সৃষ্টিশীল ভাষা। ফলে ঐতিহ্য এখানে অতীতের কোনো স্থির স্মারক হয়ে থাকেনি; বরং এক প্রজন্ম থেকে আরেক প্রজন্মে প্রবাহিত হয়ে নতুন প্রাণ পেয়েছে।

‘Alakh Niranjan’: ভক্তি ও সমর্পণের প্রশ্ন

পাঁচটি পরিবেশনার মধ্যে সবচেয়ে গভীরভাবে স্পর্শ করেছে ‘Alakh Niranjan’

গল্পে এক পরিব্রাজক সন্ন্যাসী ভিক্ষা চাইতে আসেন এক নারীর বাড়িতে। নারীটি সন্ন্যাসীর অসাধারণ চোখের প্রতি আকৃষ্ট হয়ে পড়েন। তাঁর সংসার আছে, স্বামী-সন্তান আছে; তবু সন্ন্যাসীর চোখের সেই আকর্ষণ তাঁর মনে গেঁথে যায়। মুগ্ধতা ধীরে ধীরে রূপ নেয় আকাঙ্ক্ষায়।

সন্ন্যাসী যখন বুঝতে পারেন, তাঁর চোখই অন্য একজন মানুষের আসক্তির কারণ হয়ে উঠেছে, তখন গল্প নেয় এক কঠিন মোড়। যে চোখের প্রতি নারীটি এতটা আকৃষ্ট, সেই চোখই ত্যাগ করার সিদ্ধান্ত নেন সন্ন্যাসী।

রাধে যখন কখনো নারীর মুগ্ধতা, আকাঙ্ক্ষা ও যন্ত্রণা, আবার কখনো সন্ন্যাসীর আপসহীন সমর্পণকে নিজের শরীর ও অভিব্যক্তির মধ্য দিয়ে ধারণ করছিলেন, তখন পরিবেশনার আবেগ আমাকে গভীরভাবে নাড়া দেয়।

চোখ দিয়ে পানি গড়িয়ে পড়ছিল।

পরদিন সকালেও সেই পরিবেশনার কথা বলতে গিয়ে শরীরে কাঁটা দিয়ে উঠছিল। মনে হচ্ছিল, গল্পটি যেন মঞ্চে শেষ হয়নি; বরং দর্শকের ভেতরেই তার আরেকটি যাত্রা শুরু হয়েছে।

আমার ভেতরে তখন একটি প্রশ্নই ঘুরছিল—একজন ভক্ত কত দূর যেতে পারেন?

সম্ভবত এই গল্পটি আমাকে এত গভীরভাবে স্পর্শ করেছে কারণ আমার নিজের জীবনেও ভক্তি কেবল একটি ধারণা নয়। সদগুরুর ধারায় প্রশিক্ষিত একজন Classical Hatha Yoga শিক্ষক হিসেবে আমি অনুভব করেছি, ভক্তি একজন মানুষের জীবনকে ভেতর থেকে বদলে দিতে পারে। এমন শক্তি দিতে পারে, যা মানুষকে নিজের জানা সীমা অতিক্রম করতে শেখায়। কখনো এমন কিছু সমর্পণ করতেও শেখায়, যা কেবল যুক্তি দিয়ে হয়তো সম্ভব নয়।

‘Alakh Niranjan’ তাই শুধু আবেগতাড়িত করেনি; ভক্তি, আকাঙ্ক্ষা ও আত্মসমর্পণের গভীরতা নিয়েও নতুন করে ভাবিয়েছে।

নিখুঁত নৃত্য, গভীর অনুভব

রাধে জাগ্গির নৃত্যে তাঁর শাস্ত্রীয় প্রশিক্ষণের দৃঢ়তা স্পষ্ট। তবে সেদিন শুধু তাঁর কৌশল বা নিখুঁত টেকনিকই আমাকে মুগ্ধ করেনি। বরং বেশি স্পর্শ করেছে নিখুঁততা ও অনুভবের অপূর্ব সমন্বয়।

তাঁর নৃত্যে শক্তি আছে, কিন্তু তা ভারী নয়। সৌন্দর্য আছে, কিন্তু ভঙ্গুর নয়। নাটকীয়তা আছে, অথচ একক শিল্পীর অন্তরঙ্গতা কোথাও হারিয়ে যায়নি।

আর এখানেই মনে হয়েছে, একজন শিল্পীর প্রকৃত শক্তি শুধু তিনি কতটা নিখুঁতভাবে নাচতে পারেন, তার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। তিনি দর্শককে কতটা নিজের অনুভবের ভেতরে নিয়ে যেতে পারেন, সেটিও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

মঞ্চের বাইরেও এক উষ্ণ সন্ধ্যা

রিভারসাইড স্টুডিওর হলটি দর্শকে পূর্ণ ছিল। তবে আমার কাছে সন্ধ্যাটি শুধু মঞ্চে সীমাবদ্ধ থাকেনি।

Isha-র সঙ্গে নিজের দীর্ঘদিনের যোগসূত্র ও প্রশিক্ষণের কারণে অতিথিদের অভ্যর্থনায় একটি পরিচিত উষ্ণতা অনুভব করেছিলাম। স্বেচ্ছাসেবকদের আন্তরিকতা ও আতিথেয়তাও পুরো অভিজ্ঞতার একটি নীরব অংশ হয়ে ছিল।

অনুষ্ঠান শেষে রাধের সঙ্গে কিছুক্ষণ কথা বলার সুযোগ হয়।

নিজের পরিচয় দিয়ে তাঁকে বলেছিলাম, “Sadhguru is my Guru.”

রাধে হেসে উত্তর দিয়েছিলেন, “He is my Guru too.”

খুব ছোট্ট একটি কথোপকথন। কিন্তু ভক্তির নানা রূপ নিয়ে এতক্ষণ যে পরিবেশনা দেখলাম, তার শেষে কথাটি আমার কাছে বিশেষ তাৎপর্য বহন করল।

রাধে সদগুরুর কন্যা—কিন্তু সেই মুহূর্তে তাঁর উত্তরটি কন্যার পরিচয় থেকে নয়, বরং একজন শিষ্যের নিজের গুরুকে স্বীকার করার জায়গা থেকেই এসেছে বলে আমার মনে হয়েছিল।

‘BHAKTA’ রেখে গেল যে প্রশ্ন

এই অনুষ্ঠানের টিকিট পাওয়া আমার জন্য সহজ ছিল না। শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত জানতাম না, আদৌ ভেতরে ঢুকতে পারব কি না। শেষ পর্যন্ত সেই সুযোগ হয়েছিল।

তবে সন্ধ্যা শেষে মনে হলো, সৌভাগ্যটা শুধু একটি অনুষ্ঠানে প্রবেশ করতে পারার ছিল না।

সৌভাগ্য ছিল এমন একজন শিল্পীকে দেখার—যিনি একাই একটি শাস্ত্রীয় নৃত্যভাষা এবং পাঁচটি ভিন্ন পরিবেশনার মধ্য দিয়ে আমাদের সামনে রেখে গেলেন বহু পুরোনো, অথচ আজও সমান জীবন্ত একটি প্রশ্ন—

ভক্তি কী?

‘BHAKTA’ তার কোনো সরল সংজ্ঞা দেয়নি। বরং ভক্তিকে চোখের সামনে দৃশ্যমান করে তুলেছে—কখনো কোমল, কখনো তীব্র, কখনো আনন্দময়, কখনো বেদনাদায়ক, আবার কখনো আপসহীন।

আলো জ্বলে ওঠার পরও তাই একটি প্রশ্ন সঙ্গে থেকে গেল—

যাকে আমরা সত্যিই পবিত্র বলে ধারণ করি, তার কাছে নিজেকে কত গভীরভাবে সমর্পণ করতে পারি?