২০ বছরের অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে আবাসিক ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা পর্যায়ে সৌরবিদ্যুতের ব্যবহার বাড়ানোর উদ্যোগ
ঢাকা, ৪ নভেম্বর: দেশের ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুতের ব্যবহার সম্প্রসারণে নতুন উদ্যোগ নিয়েছে পদক্ষেপ মানবিক উন্নয়ন কেন্দ্র। দুই দশকের বেশি সময়ের নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতের অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে প্রতিষ্ঠানটি ইডকলের (ইনফ্রাস্ট্রাকচার ডেভেলপমেন্ট কোম্পানি লিমিটেড) ডোমেস্টিক রুফটপ সোলার (ডিআরএস) কর্মসূচিতে ডিমান্ড অ্যাগ্রিগেটর হিসেবে কাজ করার প্রস্তুতি নিচ্ছে।
এ উদ্যোগের মাধ্যমে পরিবার, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা ও স্থানীয় জনগোষ্ঠীর মধ্যে ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুতের সম্ভাবনা তুলে ধরা, উপযুক্ত ছাদ ও বিদ্যুৎ চাহিদা চিহ্নিত করা এবং কারিগরি সেবা ও অর্থায়নের সঙ্গে সম্ভাব্য গ্রাহকদের যুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে সংস্থাটির।
রাজধানীর আগারগাঁওয়ে বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে আয়োজিত দুই দিনব্যাপী ‘বাংলাদেশ সোলার এক্সপো–২০২৬’-এ অংশ নিয়ে নিজেদের এ পরিকল্পনা ও সৌরবিদ্যুৎ খাতের অভিজ্ঞতা তুলে ধরছে পদক্ষেপ।
মঙ্গলবার (৩ নভেম্বর) প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এ প্রদর্শনীর উদ্বোধন করেন। বিদ্যুৎ বিভাগ, বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয় এবং ইডকলের যৌথ আয়োজনে দেশে প্রথমবারের মতো এ এক্সপো অনুষ্ঠিত হচ্ছে। এর প্রতিপাদ্য ‘ছাদের প্রতিটি ইঞ্চি কাজে লাগান, সৌরবিদ্যুতে আয় বাড়ান’।
জাতীয় নবায়নযোগ্য জ্বালানি উন্নয়ন কৌশল ২০২৬-২০৩০ বাস্তবায়নে সহায়তা এবং সৌরবিদ্যুতের ব্যবহার বাড়াতে সরকারি নীতি ও প্রণোদনা সম্পর্কে সংশ্লিষ্টদের অবহিত করা এ আয়োজনের অন্যতম লক্ষ্য।
এক্সপোর ৯৩ নম্বর স্টলে পদক্ষেপ সৌর প্যানেল, অফ-গ্রিড ইনভার্টার, ব্যাটারি ও সংশ্লিষ্ট যন্ত্রাংশ প্রদর্শন করছে। প্রদর্শিত সরঞ্জামের মধ্যে রয়েছে ১ দশমিক ৭ কিলোওয়াটের ইনভার্টার, ১২ ভোল্ট ১০০ অ্যাম্পিয়ার-আওয়ার এবং ৬৪ ভোল্ট ১৫০ অ্যাম্পিয়ার-আওয়ার ব্যাটারি। এ ছাড়া রয়েছে ২০০ ও ৩৫০ ওয়াটের সৌর প্যানেল।
এসব সরঞ্জামের মাধ্যমে সংস্থাটির আগে বাস্তবায়িত এবং বর্তমানে চলমান সৌরবিদ্যুৎ ও এনার্জি স্টোরেজ সিস্টেমের (ইএসএস) প্রকল্পগুলোর অভিজ্ঞতা তুলে ধরা হচ্ছে।
২০০৫ সালে সৌরবিদ্যুৎ খাতে কার্যক্রম শুরু করে পদক্ষেপ। ইডকল ও সরকারের গ্রামীণ অবকাঠামো উদ্যোগের সঙ্গে কাজ করে প্রত্যন্ত ও বিদ্যুৎসুবিধাবঞ্চিত এলাকায় সোলার হোম সিস্টেম পৌঁছে দেয় প্রতিষ্ঠানটি।
পদক্ষেপের নিজস্ব তথ্য অনুযায়ী, ২০০৬ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত দেশের ১০ জেলায় মোট ৩৬ হাজার ৮৪৩টি সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা স্থাপন করেছে সংস্থাটি। এর মধ্যে ৩৩ হাজার ৮২৩টি সোলার হোম সিস্টেম এবং ৩ হাজার ২০টি সৌর সড়কবাতি রয়েছে।
জেলাগুলো হলো খাগড়াছড়ি, রংপুর, দিনাজপুর, বরিশাল, লালমনিরহাট, কুড়িগ্রাম, বান্দরবান, সিলেট, ব্রাহ্মণবাড়িয়া ও হবিগঞ্জ। কিস্তিতে মূল্য পরিশোধের সুবিধা থাকায় স্বল্প আয়ের পরিবারগুলোর পক্ষেও এসব সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থার মালিক হওয়া সম্ভব হয়েছে।
পরবর্তী সময়ে নিজস্ব প্রতিষ্ঠান ও প্রকল্পেও সৌরবিদ্যুতের ব্যবহার বাড়িয়েছে পদক্ষেপ। ২০২২ সালে ঢাকায় সংস্থাটির প্রধান কার্যালয়ে ২৪ দশমিক ০৯ কিলোওয়াট-পিক ক্ষমতার গ্রিড-সংযুক্ত ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা স্থাপন করা হয়। এটি থেকে বছরে আনুমানিক ৩৩ হাজার ইউনিট বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা রয়েছে।
এ ছাড়া বিভিন্ন শাখা কার্যালয়ে সৌরবিদ্যুৎ ও লিথিয়াম ব্যাটারিভিত্তিক এনার্জি স্টোরেজ সিস্টেম ব্যবহার করা হচ্ছে। চলতি বছরের এপ্রিলে শিবপুর ও গৈলায় দুটি বসতবাড়ি, একটি গবাদিপশুর খামার এবং একটি মসজিদ-মাদ্রাসায় সৌরবিদ্যুৎ ও এনার্জি স্টোরেজ ব্যবস্থা স্থাপন করা হয়। চারটি স্থাপনার সম্মিলিত সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা ৮ দশমিক ৮ কিলোওয়াট-পিক।
এসব অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে ইডকলের ডোমেস্টিক রুফটপ সোলার কর্মসূচিতে ডিমান্ড অ্যাগ্রিগেটর হিসেবে কাজ করতে চায় পদক্ষেপ। এ উদ্যোগের মাঠপর্যায়ের কার্যক্রম শিগগিরই শুরু করার পরিকল্পনা রয়েছে।
পদক্ষেপের যুগ্ম পরিচালক মোহাম্মদ রাকিবুল হাসান বলেন, জাতীয় পর্যায়ে সৌরবিদ্যুতের ব্যবহার সম্প্রসারণের লক্ষ্য অর্জনে পরিবার, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা ও স্থানীয় জনগোষ্ঠীর অংশগ্রহণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
তিনি বলেন, পূর্ববর্তী প্রকল্পের অভিজ্ঞতা এবং সংস্থার বিস্তৃত সদস্যভিত্তিক নেটওয়ার্ক কাজে লাগিয়ে আরও বেশি মানুষের কাছে সাশ্রয়ী ও পরিবেশবান্ধব জ্বালানির সম্ভাবনা তুলে ধরাই এবারের এক্সপোতে অংশগ্রহণের মূল লক্ষ্য।
এদিকে ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থায় উৎপাদিত উদ্বৃত্ত বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে সরবরাহের ক্ষেত্রে প্রতি ইউনিট ১০ টাকা ৫০ পয়সা বিশেষ মূল্য নির্ধারণের বিষয়টিও এক্সপোর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে গুরুত্ব পেয়েছে।
বিদ্যুৎ বিভাগের এ-সংক্রান্ত প্রজ্ঞাপন ২০২৬ সালের ১ সেপ্টেম্বর থেকে কার্যকর হয়েছে। নেট মিটারিং নির্দেশিকা, ২০২৫-এর শর্ত পূরণ করে যেসব গ্রাহক ২০২৭ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারির মধ্যে যোগ্য সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা স্থাপন ও গ্রিডে উদ্বৃত্ত বিদ্যুৎ সরবরাহ শুরু করবেন, তাঁরা ২০৩০ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের জন্য ১০ টাকা ৫০ পয়সা পাবেন।
সরকারের ১৮ সেপ্টেম্বরের স্পষ্টীকরণ অনুযায়ী, ব্যাটারিসহ এবং ব্যাটারিবিহীন—উভয় ধরনের যোগ্য সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থার ক্ষেত্রেই এ সুবিধা প্রযোজ্য। সংশ্লিষ্টদের মতে, এ ধরনের আর্থিক প্রণোদনা ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুতে ব্যক্তি ও উদ্যোক্তাদের বিনিয়োগে উৎসাহ জোগাতে পারে।