বাহাত্তরে শেখ মুজিব সরকার প্রতিবেশী রাষ্ট্রের ওপর নির্ভরশীল পররাষ্ট্রনীতি অবলম্বন করায় পৃথিবীর অন্য শক্তিশালী দেশগুলো আমাদের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদারে পিছিয়ে গিয়েছিল।
মহান মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে নতুন রাষ্ট্র গঠনের পর বিভিন্ন দেশের সঙ্গে ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্কে না গিয়ে শেখ মুজিব সরকারের একটি নতজানু পররাষ্ট্রনীতি আমাদের পিছিয়ে দিয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন বাংলাদেশ জাতীয় সংসদের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির সভাপতি সংসদ সদস্য ব্যারিস্টার জহরত আদিব চৌধুরী। আজ বুধবার রাজধানীর শেরে বাংলা নগরে জুলাই গণঅভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘর আয়োজিত ‘স্বাধীনতা-পরবর্তী এক দশকে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির তুলনামূলক পর্যালোচনা’ শীর্ষক আলোচনায় অংশ নিয়ে তিনি এ কথা বলেন।
তিনি বলেন, ‘মুক্তিযুদ্ধের পর নতুন দেশ হিসেবে আমাদের যারা স্বীকৃতি দিচ্ছিল, তাদের সাথে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক তৈরি করার একটি সুযোগ তৈরি হয়েছিল। কিন্তু সেই সুযোগ আমরা নষ্ট করেছি। এ ছাড়া সঠিক পররাষ্ট্রনীতি অবলম্বন না করার কারণে বিদেশি অনেক সাহায্য বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। নতুন রাষ্ট্র হিসেবে সেই প্রভাব এড়াতে না পেরে দুর্ভিক্ষসহ বিভিন্ন সমস্যা আমাদের ঘিরে ধরেছিল।’
তিনি আরও বলেন, ‘স্বাধীনতা-পরবর্তী দশকের দ্বিতীয় ভাগে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান একটি ভারসাম্যপূর্ণ পররাষ্ট্রনীতি গ্রহণ করেছিলেন। তিনি জাতীয় স্বার্থকে প্রাধান্য দিয়ে যেখানে আমাদের স্বার্থ আছে সেখানেই সম্পর্ক জোরদারের চেষ্টা করেছেন। বাংলাদেশের বিপুল পরিমাণ শ্রমশক্তিকে জনশক্তি হিসেবে বিদেশে রপ্তানির দুয়ার খুলে দিয়েছেন। অন্যদিকে শেখ মুজিব সরকার দেশের গণতন্ত্র নষ্ট করে বাকশাল কায়েম করেছিল, যা বিশ্বের কাছে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি ক্ষুন্ন করেছিল।’
ভবিষ্যতের বাংলাদেশ নিয়ে জিয়াউর রহমান উদ্যোগী ছিলেন উল্লেখ করে জহরব আদিব চৌধুরী বলেন, ‘শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ইন্টারন্যাশনাল অ্যান্ড স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজ (বিআইআইএসএস) নামের একটি গবেষণাপ্রতিষ্ঠান চালু করেছিলেন, যেন পররাষ্ট্রনীতি শুধু নেতানির্ভর না হয়ে গবেষণানির্ভর হয়। ভবিষ্যৎ বাংলাদেশের তরুনরাও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে রাষ্ট্রকে শক্তিশালী অবস্থানে নিয়ে যেতে পারে।’
জুলাই জাদুঘরে ‘গণতান্ত্রিক অভিযাত্রা সেমিনার সিরিজ’-এর চতুর্থ পর্ব ‘স্বাধীনতা-পরবর্তী এক দশকে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির তুলনামূলক পর্যালোচনা’ শীর্ষক আয়োজনে আলোচক হিসেবে আরও অংশ নেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের শিক্ষক ড. মো. আব্দুল মান্নান। তিনি বলেন, ‘মুক্তিযুদ্ধে ভারত তাদের কৌশলগত স্বার্থের জন্য বাংলাদেশকে সহায়তা করেছিল। কিন্তু ৫ আগস্টের আগে আওয়ামী লীগ সরকার এমনভাবে প্রচার করত, যেন ভারত স্বয়ং স্বাধীন বাংলাদেশ উপহার দিয়েছে। এই বক্তব্যের মাধ্যমে আমাদের মুক্তিযোদ্ধাদের অপমান করা হতো।’
তিনি বলেন, ‘ভারত সব সময়ই তাদের স্বার্থের জন্য বাংলাদেশকে নতজানু হিসেবে দেখতে চেয়েছে। অন্যদিকে মুক্তিযুদ্ধের পর পাকিস্তান ক্যাম্পেইন করত যে বাংলাদেশ জন্মের মাধ্যমে মুলত একটি মুসলিম দেশকে দুই ভাগ করা হয়েছে। ফলত বাংলাদেশের স্বতন্ত্র পররাষ্ট্রনীতি দাঁড় করানো চ্যালেঞ্জিং ছিল। শেখ মুজিবুর রহমান নতজানু পররাষ্ট্রনীতির দিকে গিয়ে সেই পথ আরও দীর্ঘ করেছেন।’
তিনি আরও বলেন, ‘জিয়াউর রহমান ক্ষমতায় আসার পর চেষ্টা করেছিলেন ভারতের সাথে একটি ভারসাম্যপূর্ণ দ্বিপাক্ষীয় সম্পর্ক তৈরি করার। অন্যদিকে পাকিস্তানের লাগাতার ক্যাম্পেইনের কারণে মুসলিম বিশ্বে বাংলাদেশের অবস্থান শক্তিশালী ছিল না। জিয়াউর রহমান সেদিকটায় মনোযোগ দেন এবং মুসলিম বিশ্বে বাংলাদেশের স্বতন্ত্র অবস্থান তৈরি করেন।’
অনুষ্ঠানের সভাপ্রধানের বক্তব্যে জুলাই গণঅভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘরের মহাপরিচালক এহ্সান মাহমুদ বলেন, ‘স্বাধীনতা-পরবর্তী এক দশকে পররাষ্ট্রনীতির অবস্থা বুঝতে হলে মোটাদাগে শেখ মুজিবুর রহমান এবং শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের কথাই সামনে আসে। শেখ মুজিবের শাসনামল নিয়ে আমাদের প্রবীণ নাগরিকেরা বলতেন “পাকিস্তানকে কি বিদায় করেছি ভারতীয় গোলামি করার জন্য?” অর্থাৎ পাকিস্তানের বিরুদ্ধে যে দীর্ঘ লড়াই ছিল, সেটির পর যখন দেশ স্বাধীন হলো, তখন শেখ মুজিবুর রহমানের নতজানু পররাষ্ট্রনীতির কারণে লড়াই-সংগ্রামের মাধ্যমে তারুণ্য পার করা নাগরিকদের মনে হলো, দেশ এখন পাকিস্তানের বেড়াজাল থেকে বেরিয়ে ভারতের হাতে চলে এসেছে। তারা এটা মেনে নিতে পারেনি।’
তিনি আরও বলেন, ‘জিয়াউর রহমান হিজবুল বাহার নামক একটি জাহাজে মেধাবী শিক্ষার্থীদের নিয়ে মাঝেমধ্যেই সমুদ্রসীমা দেখাতে নিয়ে যেতেন। একটি দেশের রাষ্ট্রপতি সে দেশের তরুণদের নিয়ে দেখাতেন সমুদ্রসীমা, নিজে দেখাতেন, এটা আমাদের স্বার্বভৌমত্বের অংশ, যেন ভবিষ্যৎ বাংলাদেশ গড়ার কারিগরেরা নিজে শিক্ষাটা পায়। তিনি শুধু নিজে বাংলাদেশকে স্বাবলম্বী করার পাশাপাশি; বরং ভবিষ্যতের বাংলাদেশের নাগরিকেরা যেন আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নিজ দেশকে শক্তিশালী অবস্থানে নিয়ে যেতে পারেন, সেই শিক্ষাও দিয়ে গিয়েছিলেন।’
‘স্বাধীনতা-পরবর্তী এক দশকে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির তুলনামূলক পর্যালোচনা’ শীর্ষক সেমিনার সঞ্চালনা করেন লেখক ও গবেষক তুহিন খান। সেমিনারে অংশগ্রহণ করেন বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, গবেষক, আইনজীবী, শিক্ষার্থী এবং নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিবৃন্দ।