স্বাস্থ্যব্যবস্থা পুনর্গঠনে সরকারের সমন্বিত পরিকল্পনা ঘোষণা
উপজেলা হাসপাতালের সক্ষমতা বৃদ্ধি, তৃণমূল পর্যায়ে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা সম্প্রসারণ, বিপুলসংখ্যক স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগ, রোগনির্ণয় সুবিধার আধুনিকায়ন ও ক্যান্সার চিকিৎসার বিকেন্দ্রীকরণের মাধ্যমে দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থা পুনর্গঠনে সমন্বিত পরিকল্পনা ঘোষণা করেছে সরকার।
আমূল পরিবর্তনের প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে চলতি অর্থবছরে স্বাস্থ্যখাতে রেকর্ড ৬৯ হাজার ৪০৯ কোটি টাকা বরাদ্দ দিয়েছে সরকার, যা জাতীয় বাজেটের মোট বরাদ্দের ৭ দশমিক ৪ শতাংশ।
স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ প্রতিমন্ত্রী ড. এম এ মুহিত বাসস-কে বলেন, ‘১৫ বছরের ফ্যাসিবাদী শাসনামলের দুর্নীতি ও অন্তর্বর্তী সরকারের সময় অব্যবস্থাপনার কারণে আমরা একটি ভেঙে পড়া স্বাস্থ্যব্যবস্থা পেয়েছি। ইউনিয়ন ও উপজেলা পর্যায়ের অনেক স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানে বছরের পর বছর পর্যাপ্ত সংস্কার হয়নি।’
তিনি আরও বলেন, এ কারণে দায়িত্ব গ্রহণের পর বর্তমান সরকার দেশের সামগ্রিক স্বাস্থ্যব্যবস্থা পুনর্গঠনে একটি সমন্বিত পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। এটি এক বা দু’টি প্রকল্পের বিষয় নয়, একটি সমন্বিত পরিকল্পনার মাধ্যমে আমাদের স্বাস্থ্যব্যবস্থা পুনর্গঠন করতে হবে।
উপজেলা হাসপাতালের ব্যাপক উন্নয়ন :
জেলা ও বিভাগীয় পর্যায়ের হাসপাতালগুলোর ওপর চাপ কমানোর লক্ষ্যে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলোর পর্যায়ক্রমিক উন্নয়ন এবং সেখানে বিশেষায়িত ও জরুরি স্বাস্থ্যসেবা সম্প্রসারণে সরকার ৪৪ হাজার ৭৫৭ কোটি ৩৮ লাখ ৫০ হাজার টাকার প্রকল্প প্রস্তাব করেছে।
২০২৬ সালের ডিসেম্বর থেকে ২০২৯ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত বাস্তবায়নের জন্য নির্ধারিত প্রকল্পটি বর্তমানে চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে। এর আওতায় ১৮টি হাসপাতালকে ৫১ শয্যায়, ৩০৫টি হাসপাতালকে ১০১ শয্যায়, ৮৩টি হাসপাতালকে ১৩২ শয্যায়, ১৩টি হাসপাতালকে ১২০ শয্যায়, ৯টি হাসপাতালকে ১৫১ শয্যায় এবং আরও ১৫টি হাসপাতালকে ১৫১ শয্যায় উন্নীত করার পরিকল্পনা রয়েছে।
এতে ৪৪৩টি উপজেলায় সমন্বিত বহুতল সেবাভবন নির্মাণ এবং ১৫টি উপজেলায় চিকিৎসক, নার্স ও অন্যান্য কর্মীদের জন্য আবাসন সুবিধা প্রতিষ্ঠার বিষয়টিও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
ড. মুহিত বলেন, ‘জনসংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যাওয়ায় অনেক এলাকার বিদ্যমান ৩০ ও ৫০ শয্যার উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলো আর পর্যাপ্ত নয়। বর্তমানে কিছু উপজেলা ৮ থেকে ১০ লাখ মানুষকে স্বাস্থ্যসেবা দিচ্ছে।’
এ সময় তিনি আরও বলেন, এ কারণে সরকার দেশের সবমিলিয়ে ৫০৩টি উপজেলার স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সকে পূর্ণাঙ্গ ১৫১ শয্যার হাসপাতালে রূপান্তরের একটি ‘ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত’ নিয়েছে।
উন্নীত এসব স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানে নিবিড় পরিচর্যা ও করোনারি কেয়ার, ওয়ান-স্টপ জরুরি সেবা, মেডিসিন, সার্জারি, নাক-কান-গলা, চক্ষু, শিশু, মাতৃস্বাস্থ্য, কিডনি ডায়ালাইসিস, ক্যান্সার স্ক্রিনিং এবং ফিজিওথেরাপি সেবা দেওয়া হবে। পাশাপাশি স্ট্রোক ও পক্ষাঘাতগ্রস্ত রোগীদের জন্য সেবার পাশাপাশি প্যাথলজিক্যাল ও অন্যান্য রোগনির্ণয় সুবিধাও থাকবে।
প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে যাবে মানুষের আরও কাছে :
সরকার ইউনিয়ন ও ওয়ার্ড পর্যায়ে ১৪ হাজার ৬৩৪টি প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা হাব এবং ১ হাজার ৬৩১টি প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র প্রতিষ্ঠায় ১১ হাজার ৯৯৩ কোটি ২৫ লাখ ৮২ হাজার টাকার আরেকটি প্রকল্প প্রস্তাব করেছে।
২০২৬ সালের ডিসেম্বর থেকে ২০২৯ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত বাস্তবায়নের জন্য নির্ধারিত এ প্রকল্পটিও বর্তমানে চূড়ান্তকরণের পর্যায়ে রয়েছে। এর আওতায় হাবের জন্য ৫ হাজার ৯৩৬টি স্থাপনা পুনর্নির্মাণ, ৮ হাজার ৩৪৮টি স্থাপনা মেরামত বা পুনর্বিন্যাস এবং ৩৫০টি নতুন স্থাপনা নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে। কেন্দ্রগুলোর ক্ষেত্রে ৪২৮টি স্থাপনা পুনর্নির্মাণ, ৬০৫টি স্থাপনা মেরামত বা পুনর্বিন্যাস ও ৫৯৮টি নতুন স্থাপনা নির্মাণের প্রস্তাব করা হয়েছে।
এ প্রকল্পে ৬ হাজার ২৮৬টি নতুন বা পুনর্নির্মিত হাব ও ১ হাজার ২৬টি নতুন বা পুনর্নির্মিত কেন্দ্রের জন্য আসবাবপত্র সরবরাহের পাশাপাশি ১ হাজার ২৬টি কেন্দ্রের জন্য চিকিৎসা সরঞ্জামের ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে। সহায়ক অবকাঠামোর মধ্যে নিরাপদ পানি, বিদ্যুৎ বা সৌরবিদ্যুৎ, স্যানিটেশন, পয়োনিষ্কাশন ব্যবস্থা, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, অগ্নিনিরাপত্তা ও সহজে প্রবেশযোগ্য প্রবেশপথ অন্তর্ভুক্ত থাকবে।
ড. মুহিত বলেন, সরকার তার সংস্কার পরিকল্পনার কেন্দ্রে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবাকে রেখে এ প্রকল্প গ্রহণ করেছে।
প্রকল্পটি সম্পন্ন হলে প্রশিক্ষিত ও প্রয়োজনীয় সরঞ্জামসমৃদ্ধ প্রায় ১ লাখ ৪০ হাজার স্বাস্থ্যকর্মী এসব প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে স্বাস্থ্যসেবা প্রদান করবেন।
তারা নিয়মিতভাবে অন্তত প্রতি দুই মাসে একবার মানুষের বাড়ি বাড়ি যাবেন এবং প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা-সংক্রান্ত পরামর্শ ও সেবা দেবেন। তারা রক্তচাপ ও রক্তে গ্লুকোজের মাত্রা পরীক্ষা করতে পারবেন, যাতে উচ্চ রক্তচাপ ও ডায়াবেটিস প্রাথমিক পর্যায়ে শনাক্ত করা যায়। পাশাপাশি উন্নত চিকিৎসার প্রয়োজন এমন রোগীদের উপজেলা পর্যায়ের স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানে পাঠাতে পারবেন।
ড. মুহিত বলেন, ‘আমরা শুধু মানুষের দোরগোড়ায় নয়, বরং তাদের ঘরের ভেতরে স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দিতে চাই।’
চিকিৎসক, নার্স ও মিডওয়াইফ নিয়োগ :
দেশে স্বাস্থ্যসেবা পেশাজীবীদের তীব্র সংকট থাকায় সরকার চিকিৎসক, প্যারামেডিকস, নার্স, মিডওয়াইফ ও স্বাস্থ্যকর্মীসহ স্বাস্থ্যসেবা কর্মী নিয়োগে ব্যাপক পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে।
ড. মুহিতের তথ্যমতে, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সুপারিশ করা সংখ্যার মাত্র এক-তৃতীয়াংশ নার্স রয়েছে বাংলাদেশে। অন্যদিকে মেডিকেল টেকনোলজিস্ট ও অন্যান্য স্বাস্থ্য পেশাজীবীরও সংকট রয়েছে।
তিনি বলেন, এ কারণে সরকার বাংলাদেশ সরকারি কর্ম কমিশনের (পিএসসি) মাধ্যমে ইতোমধ্যেই ৫ হাজার চিকিৎসক নিয়োগের প্রক্রিয়া শুরু করেছে। এ ছাড়া সরকারের প্রথম আট মাসে কয়েক হাজার চিকিৎসক নিয়োগ দিয়ে উপজেলা পর্যায়ে পদায়ন করা হয়েছে।
আরও ২ হাজার ৫০০ নার্স নিয়োগের প্রক্রিয়াও শুরু হয়েছে। মাতৃস্বাস্থ্যসেবা জোরদার ও নিরাপদ সন্তান প্রসব নিশ্চিত করতে আগামী পাঁচ বছরে ২৫ হাজার মিডওয়াইফ নিয়োগ করা হবে।
এছাড়া বিদ্যমান ৪০ হাজার স্বাস্থ্যকর্মীর পাশাপাশি আরও ১ লাখ স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগের পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের। এতে মোট স্বাস্থ্যকর্মীর সংখ্যা দাঁড়াবে প্রায় ১ লাখ ৪০ হাজারে। তারা ইউনিয়ন ও ওয়ার্ড পর্যায়ে স্বাস্থ্যসেবা প্রদান করবেন।
ড. মুহিত বলেন, প্রথম পর্যায়ে ৩০ হাজার স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগের প্রক্রিয়া ইতোমধ্যেই শুরু হয়েছে।
ক্যান্সার চিকিৎসার বিকেন্দ্রীকরণ :
আগামী দুই থেকে তিন বছরের মধ্যে দেশের আটটি প্রশাসনিক বিভাগে পূর্ণাঙ্গ ক্যান্সার চিকিৎসাকেন্দ্র প্রতিষ্ঠা ও চালুর পরিকল্পনা নিয়ে ক্যানসার চিকিৎসার বিকেন্দ্রীকরণে বড় ধরনের পদক্ষেপ নিচ্ছে সরকার।
এছাড়া সুনামগঞ্জ, টাঙ্গাইল, নোয়াখালী, পটুয়াখালী ও কিশোরগঞ্জের মেডিকেল কলেজ হাসপাতালগুলোতে পাঁচটি ইনস্টিটিউট অব নিউক্লিয়ার মেডিসিন অ্যান্ড অ্যালায়েড সায়েন্সেস (আইএনএমএএস) প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। এজন্য প্রস্তাবিত ব্যয় ধরা হয়েছে ৫৩৫ কোটি ৫৪ লাখ টাকা।
কর্মকর্তাদের তথ্যমতে, ২০৩০ সালের জুনের মধ্যে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করা হবে।
এছাড়া দেশব্যাপী ক্যান্সার চিকিৎসার সক্ষমতা বাড়াতে সরকার ১৭টি লিনিয়ার অ্যাক্সিলারেটর কেনার পরিকল্পনা করেছে। পাশাপাশি প্রথমবারের মতো পাঁচটি অত্যাধুনিক রোবোটিক সার্জারি মেশিন কেনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
ড. মুহিত বলেন, বিশেষায়িত ক্যান্সার চিকিৎসা ঢাকা ও কয়েকটি বড় শহরে কেন্দ্রীভূত থাকায় ক্যান্সার রোগী ও তাদের পরিবারগুলো চরম আর্থিক সংকটের মুখে পড়ছে। এতে অনেককে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে চিকিৎসা নিতে হচ্ছে এবং যাতায়াতে বিপুল অর্থ ব্যয় করতে হচ্ছে।
এ পরিস্থিতিতে রোগীদের বাড়ির কাছাকাছি ক্যান্সার চিকিৎসা পৌঁছে দিতে সরকার পদক্ষেপ নিয়েছে বলেও জানান তিনি।
নতুন স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনা ইনস্টিটিউট ও চিকিৎসা সরঞ্জাম সংগ্রহ :
সরকার সাভারে একটি স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনা ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠা করছে, যেটিকে বাংলাদেশে এ ধরনের প্রথম প্রতিষ্ঠান হিসেবে বর্ণনা করেছেন ড. মুহিত।
তিনি বলেন, চিকিৎসকদের সাধারণত ক্লিনিক্যাল সেবা প্রদানের বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেওয়া হলেও ব্যবস্থাপনা ও অর্থায়ন বিষয়ে পর্যাপ্ত শিক্ষা দেওয়া হয় না। অথচ পরবর্তী সময়ে তাদের অনেকেই উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা অথবা সিভিল সার্জন হিসেবে স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
এ কারণে ইনস্টিটিউটটি আগামী ১ জানুয়ারি উদ্বোধনের জন্য প্রস্তুত করা হচ্ছে। সেখানে সিভিল সার্জন এবং উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তারা স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনা বিষয়ে বিশেষায়িত প্রশিক্ষণ পাবেন।
এছাড়া চিকিৎসা সরঞ্জামের ঘাটতি ও অকেজো যন্ত্রপাতি শনাক্ত করতে সরকার দেশব্যাপী চিকিৎসা সরঞ্জামের নিরীক্ষা সম্পন্ন করেছে।
ড. মুহিত বলেন, অনেক উপজেলা পর্যায়ের স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানে কার্যকর এক্স-রে ও আলট্রাসনোগ্রাফি মেশিনসহ প্রয়োজনীয় রোগনির্ণয় সরঞ্জামও নেই।
তিনি আরও বলেন, স্বাস্থ্যসেবা অবকাঠামো ও সেবার মান উন্নয়নে শিগগিরই ১৬ হাজার কোটি টাকার একটি দরপত্র আহ্বান করা হবে। এ কর্মসূচির আওতায় উপজেলা পর্যায়ের স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানে নির্মাণ ও উন্নয়ন, ইউনিয়ন পর্যায়ের প্রতিষ্ঠানগুলোর সংস্কার এবং চিকিৎসা সরঞ্জাম সংগ্রহ করা হবে।
জরুরি প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম, বিশেষ করে সচল এক্স-রে ও আলট্রাসনোগ্রাফি মেশিন সংগ্রহকে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে, যাতে উপজেলা পর্যায়েই রোগীরা বিলম্ব ছাড়াই প্রয়োজনীয় রোগনির্ণয় সেবা পেতে পারেন।