দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য ও বিনিয়োগ বাড়াতে বাংলাদেশ-মালয়েশিয়া মুক্ত বাণিজ্য চুক্তির আনুষ্ঠানিক আলোচনা ঢাকায় শুরু হয়েছে। ২০২৭ সালের মধ্যে চুক্তি চূড়ান্ত করার লক্ষ্য দুই দেশের।
ঢাকা, ২৭ অক্টোবর ২০২৬: দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সম্প্রসারণের লক্ষ্যে বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়ার মধ্যে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) নিয়ে আনুষ্ঠানিক আলোচনা শুরু হয়েছে। দুই দেশ ২০২৭ সালের মধ্যে একটি আধুনিক, ভারসাম্যপূর্ণ ও পারস্পরিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট চুক্তি চূড়ান্ত করতে চায়।
মঙ্গলবার সকালে ঢাকার প্যান প্যাসিফিক সোনারগাঁও হোটেলে তিন দিনব্যাপী প্রথম দফার আলোচনা উদ্বোধন করেন বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সচিব শরফ উদ্দিন আহমদ চৌধুরী। উদ্বোধনী অধিবেশনে আলোচনার কাঠামো ও কার্যপরিধি নির্ধারণে দুই দেশের মধ্যে ‘টার্মস অব রেফারেন্স’ (টিওআর) স্বাক্ষরিত হয়।
অনুষ্ঠানে মালয়েশিয়ার ৩১ সদস্যের প্রতিনিধিদলের প্রধান ও দেশটির প্রধান আলোচক ড. রশিদি সাইদ এবং বাংলাদেশের প্রধান আলোচক ও বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব খাদিজা নাজনীনসহ দুই দেশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে বাণিজ্যসচিব শরফ উদ্দিন আহমদ চৌধুরী বলেন, ঐতিহাসিক বন্ধুত্ব এবং অভিন্ন সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় মূল্যবোধের ভিত্তিতে বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়ার সম্পর্ক সুদৃঢ় হয়েছে। দুই দেশের বিদ্যমান বাণিজ্য সম্পর্ক আশাব্যঞ্জক হলেও বাণিজ্য বহুমুখীকরণ ও বিনিয়োগ সম্প্রসারণের বিপুল সম্ভাবনা এখনো পুরোপুরি কাজে লাগানো যায়নি।
তিনি বলেন, গত জুনে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের মালয়েশিয়া সফরকালে দেশটির প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিমের সঙ্গে ২০২৭ সালের মধ্যে একটি টেকসই ও পারস্পরিক স্বার্থরক্ষাকারী এফটিএ সম্পন্ন করার বিষয়ে আলোচনা হয়। ঢাকায় প্রথম দফার আনুষ্ঠানিক আলোচনার মধ্য দিয়ে সেই অঙ্গীকার বাস্তবায়নের প্রাতিষ্ঠানিক প্রক্রিয়া শুরু হলো।
বাণিজ্যসচিব বলেন, স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে উত্তরণের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা এবং আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা ধরে রাখতে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সংযোগস্থল হিসেবে বাংলাদেশ মালয়েশীয় বিনিয়োগকারীদের জন্য সম্ভাবনাময় বাজার উল্লেখ করে তিনি বলেন, হালাল শিল্প, সেমিকন্ডাক্টর খাতে দক্ষতা উন্নয়ন, ডিজিটাল বাণিজ্য, লজিস্টিকস এবং বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলে যৌথ বিনিয়োগের সুযোগ রয়েছে।
এ সময় আঞ্চলিক অর্থনৈতিক জোট রিজিওনাল কমপ্রিহেনসিভ ইকোনমিক পার্টনারশিপে (আরসিইপি) বাংলাদেশের যোগদানের আকাঙ্ক্ষার প্রতি মালয়েশিয়ার সমর্থনের জন্য কৃতজ্ঞতা জানান তিনি।
মালয়েশিয়ার প্রধান আলোচক ড. রশিদি সাইদ বলেন, প্রস্তাবিত এফটিএ কেবল শুল্ক কমানোর চুক্তি নয়; বরং দুই দেশের মধ্যে দীর্ঘমেয়াদি ও সুষম অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব প্রতিষ্ঠার একটি কৌশলগত উদ্যোগ।
তাঁর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়ার মধ্যে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যের পরিমাণ ছিল প্রায় ২৮৪ কোটি মার্কিন ডলার। এফটিএ কার্যকর হলে বাণিজ্য সম্প্রসারণ, শিল্পায়ন ও বিনিয়োগে নতুন সম্ভাবনা তৈরি হবে।
পারস্পরিক সমঝোতা, নমনীয়তা ও বাস্তবসম্মত কর্মপরিকল্পনার ভিত্তিতে ২০২৭ সালের মধ্যে আলোচনা শেষ করার আশাবাদ ব্যক্ত করেন তিনি। মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রীর আসন্ন বাংলাদেশ সফর এ প্রক্রিয়াকে আরও গতিশীল করবে বলেও আশা প্রকাশ করেন রশিদি সাইদ।
বাংলাদেশের প্রধান আলোচক খাদিজা নাজনীন বলেন, এফটিএ কার্যকর হলে দুই দেশের বাজারে প্রবেশাধিকার সহজ হবে, বাণিজ্য বাধা কমবে এবং বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানের নতুন সুযোগ সৃষ্টি হবে। একই সঙ্গে বাণিজ্য কার্যক্রম আরও স্বচ্ছ, সহজ ও পূর্বানুমানযোগ্য হবে।
তিনি জানান, আলোচনায় পণ্য ও সেবা বাণিজ্য, পণ্যের উৎপত্তিবিধি (রুলস অব অরিজিন) এবং শুল্কসংক্রান্ত প্রক্রিয়াসহ গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোতে দুই দেশের স্বার্থ রক্ষা করে ঐকমত্য প্রতিষ্ঠার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
দুই দেশের প্রতিনিধিরা গঠনমূলক সংলাপ, পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও নমনীয়তার ভিত্তিতে একটি ভারসাম্যপূর্ণ, কার্যকর ও দীর্ঘমেয়াদি চুক্তিতে পৌঁছানোর অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেন।
বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়ার মধ্যে এফটিএ নিয়ে প্রথম দফার আলোচনা আগামী ২৯ অক্টোবর পর্যন্ত চলবে।