Favicon

এলামনাই সিস্টারহুড থেকে অস্ট্রেলিয়াজুড়ে পরিবর্তনের পথে ভিএঅস

প্রতিবেদক: মাজহারুল ইসলাম মিচেল সেপ্টেম্বর ১৮, ২০২৬, ২:০৯ অপরাহ্ণ বিভাগ: মেট্রোপলিটন
এলামনাই সিস্টারহুড থেকে অস্ট্রেলিয়াজুড়ে পরিবর্তনের পথে ভিএঅস
Photo: Courtesy
ভিকারুন্নিসা অ্যালামনাই অস্ট্রেলিয়া (ভিএঅস), একটি নন-প্রফিট   অরগানাইজেশন যা  অস্ট্রেলিয়ার আটটি প্রাদেশিক অঞ্চল জুড়ে প্রবাসী কমিউনিটির জন্য কাজ করে।

ছোটবেলায় আমরা সবাই বড় হওয়ার জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করতাম। কিন্তু স্কুলের শেষ দিনটা আসতেই সেই উত্তেজনা ধীরে ধীরে ফিকে হয়ে যেতো। বছরের পর বছর ধরে এক সাথে একই শ্রেণিকক্ষ, করিডোর, খেলার মাঠ, হাসি-ঠাট্টা আর ছোট ছোট মুহূর্তগুলো ভাগ করে নেওয়ার পর, প্রত্যেকেই যখন ভিন্ন পথে পা বাড়ায়, তখন সবকিছুই স্মৃতি হয়ে যায় এক নিমিষে। আর সেই দিনটা শেষে মনে একটাই প্রশ্ন থেকে যায়, এই চেনা মুখগুলোর সাথে আবার কবে দেখা হবে? 

ভিকারুন্নিসা নুন স্কুল অ্যান্ড কলেজের একই শ্রেণিকক্ষে পড়া এই প্রাক্তনীদের বন্ধুত্ব অবশ্য সেখানেই থেমে থাকেনি। অনেক বছর পরও, অস্ট্রেলিয়ার বিভিন্ন প্রান্তে বসবাস করে সেই বন্ধন তাদের একসঙ্গে রেখেছিল। ২০১৬ সালের অক্টোবরে, সিডনিতে এক রেস্টুরেন্টে বসে কয়েকজন প্রাক্তনী আবার একে অপরের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। সেই ছোট্ট উদ্যোগই ধীরে ধীরে ভিকারুন্নিসা অ্যালামনাই অস্ট্রেলিয়া বা ভিএঅস-এ রূপ নেয়। সংগঠনটি ২০১৭ সালের মার্চে আনুষ্ঠানিকভাবে প্রতিষ্ঠিত হয় এবং পরে ২০২২ এ একটি দাতব্য সংস্থা হিসেবে নিবন্ধিত হয়।

সময়ের সঙ্গে এই সংগঠন টি অস্ট্রেলিয়ার আটটি প্রাদেশিক অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ে। আর তখনই তাদের সামনে আসে একটি নতুন ভাবনা, “আমরা অন্যদের জন্য কী করতে পারি?”

এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে তারা নিজেদের গণ্ডির বাইরে তাকাতে শুরু করেন। আশপাশের মানুষ কী ধরনের সমস্যার মুখোমুখি হচ্ছেন, সেদিকেও নজর দেন। যে সমস্যাটি প্রথম তাদের বেশি ভাবায়, তা হলো ডমেস্টিক ভায়োলেন্স। বিদেশে থাকলে অনেক সময় মনে হতে পারে, নারীদের হয়তো তেমন কোন সমস্যার মুখোমুখি হতে হয় না। কিন্তু বাস্তবতা অনেক সময় একেবারেই ভিন্ন।

কোভিড-১৯ মহামারীর সময় বিষয়টি আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। সেই সময় বিশ্বজুড়ে বিভিন্ন প্রতিবেদনে নারীদের ওপর ডমেস্টিক ভায়োলেন্স বেড়ে যাওয়ার কথা উঠে আসে। তবে প্রাক্তনীদের কাছে এটি শুধু কোনো খবর ছিল না। তাদেরই এক সহপাঠী যখন গর্ভবতী অবস্থায় বাড়ি থেকে বের হয়ে যেতে বাধ্য হন, তখন বিষয়টি তাদের খুব কাছের হয়ে ওঠে। তার কথা জানার পর, সদস্যরা মিলে তাকে সাহায্য করার জন্য অর্থ সংগ্রহ করেন।

তবে তাকে আর আরো মানুষকে সাহায্য করতে গিয়ে প্রাক্তনীরা বুঝতে পারেন, তাৎক্ষণিক সাহায্য গুরুত্বপূর্ণ হলেও এটিই পুরো সমাধান নয়। ভিএঅস-এর প্রাক্তন প্রেসিডেন্ট ও অ্যাডভাইসর ড. সুরঞ্জনা জেনিফার রহমান প্রশ্ন তোলেন, “আমরা শুধু ভিকটিমদের সাহায্য করছি। কিন্তু এটাই কি যথেষ্ট? যারা এই শারীরিক ও মানসিক ক্ষতির কারন, তাদের নিয়ে কি করবো ?” তাই সহিংসতার শিকার নারীদের পাশে দাঁড়ানোর পাশাপাশি, এমন পরিস্থিতি শুরুতেই কীভাবে প্রতিরোধ করা যায়, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।

এই ভাবনা থেকেই শুরু হয় ‘চেঞ্জ দ্য স্টোরি: মেন অ্যাজ চ্যাম্পিয়নস’। এর মাধ্যমে পুরুষদের ডমেস্টিক ভায়োলেন্স নিয়ে খোলামেলা কথা বলা, এর প্রভাব বোঝা এবং একটি নিরাপদ সমাজ গড়তে এই পুরুষ রা কী ভূমিকা রাখতে পারেন, তা নিয়ে ভাবার সুযোগ তৈরি করা হয়।

তবে শুধু নিরাপদ পরিবেশ তৈরি করাই যথেষ্ট নয়। যারা এমন পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে গেছেন, তাদের নতুন করে জীবন শুরু করার সুযোগ দেওয়াও জরুরি। এই ভাবনা থেকেই তৈরি হয় ‘হার বিজনেস’। এই উদ্যোগ নতুন করে অস্ট্রেলিয়ায় আসা এবং ডমেস্টিক ভায়োলেন্সের শিকার নারীদের দক্ষতা অর্জন ও আর্থিকভাবে স্বাবলম্বী হতে সাহায্য করে।
ভিএঅস-এর প্রাক্তন প্রেসিডেন্ড ও অ্যাডভাইসর ড. মাহবুবা খানম মুক্তা বলেন, “নারীদের নিজেদের স্বাবলম্বী হতে এবং একটি ভালো ভবিষ্যৎ গড়তে প্রয়োজনীয় দক্ষতা ও আত্মবিশ্বাস থাকা জরুরি।” আটটি ওয়ার্কশপের মাধ্যমে ১২ জন নারী  সেলাই ও হোম বিজনেসের মতো কাজে প্রশিক্ষণ নেন এবং বর্তমানে তারা সবাই কর্মরত আছেন। প্রাক্তনীরা ডমেস্টিক ভায়োলেন্সের শিকার নারীদের আশ্রয়কেন্দ্রের নানা লবিধ সুবিধা উন্নত করার জন্য ৬,০০০ অস্ট্রেলিয়ান ডলার সংগ্রহ করেছেন। নারীদের নতুন করে জীবন গড়ার পথে এটিও ছিল আরেকটি জরুরি  সহায়তা।

তাদের কাজ এগিয়ে চলার সঙ্গে সঙ্গে প্রাক্তনীরা বুঝতে শুরু করেন, সাহায্যের প্রয়োজন সবসময় বড় কোনো সমস্যা নিয়ে হয় না। অনেক সময় ছোট ছোট দৈনন্দিন প্রয়োজনও মানুষের জীবনে বড় প্রভাব ফেলে। এর মধ্যে একটি হলো মাসিককালীন স্বাস্থ্যবিধি। মাসিক নারী জীবনের স্বাভাবিক একটি অংশ হলেও, আর্থিক সমস্যায় থাকা নারী ও মেয়েরা সব সময় এই প্রয়োজনীয় সামগ্রী যোগাড় করে পারেন না।
ভিএঅস-এর জেনারেল সেক্রেটারি  রিফায়াত রোনাক ইকো বলেন, “মাসিককালীন সামগ্রী একটি মৌলিক প্রয়োজন। কোনো নারীর তা কেনার সামর্থ্য নেই বলে তার স্বাস্থ্যবিধির সঙ্গে আপস করতে হবে না।” এই ভাবনা থেকেই ভি এ অস ‘শেয়ার দ্য ডিগনিটি’-কে সমর্থন করে। এর মাধ্যমে স্কুল, পাবলিক টয়লেট এবং কেয়ার হ্যাম্পারের মাধ্যমে নারীদের মাসিককালীন সামগ্রী দেওয়ার জন্য ফান্ড সংগ্রহ করা হয়। 

মৌলিক চাহিদার এই ভাবনা থেকেই শিশুদের জন্যও শুরু হয় ‘ইট আপ’। এর লক্ষ্য ছিল, পরিবারের আর্থিক সমস্যার কারণে যেসব শিশু দুপুরের খাবার নিয়ে স্কুলে যেতে পারে না, তাদের জন্য টিফিনের ব্যবস্থা করা। “আমরা অনুভব করলাম যে কোনো শিশু যেন ক্ষুধার্ত অবস্থায় স্কুলে না যায়, তা নিশ্চিত করার জন্য আমাদের কিছু একটা করতে হবে।” ২০২৪ সালের মার্চে, ভিএঅস  একটি "মর্নিং টি" আয়োজন করে ২,৫০০ অস্ট্রেলিয়ান ডলার সংগ্রহ করে। পরে ২০ জন স্বেচ্ছাসেবক মিলে মাত্র ৮০ মিনিটে দুটি সরকারি স্কুলের জন্য ১,০৮৭টি স্যান্ডউইচ তৈরি করেন যা বিতরন করা হয় সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের মাঝে। 

বছরের পর বছর নারী ও শিশুদের পাশে দাঁড়ানোর পর, প্রাক্তনীরা এবার তাদের বেড়ে ওঠার দেশ,  তাদের জন্মভূমি বাংলাদেশ নিয়ে ভাবতে শুরু করেন। তারা চিন্তা করেন,  যে বন্ধন তাদেরকে একসঙ্গে রেখেছে, সেই বন্ধন কি বাংলাদেশের মানুষের জন্যও কাজে লাগানো যায়? বিশেষ করে যারা সুযোগ থেকে বঞ্চিত, তাদের জন্য কি নতুন সুযোগ তৈরি করা সম্ভব?

এই ভাবনাটি নতুন রূপ পায় যখন ভিএঅস -এর বর্তমান প্রেসিডেন্ট মারিয়াম শামস মাস্টারশেফ অস্ট্রেলিয়া সিজন ১৩-এর দ্বিতীয় রানার-আপ কিশোয়ার চৌধুরীর সঙ্গে যোগাযোগ করেন। কিশোয়ারেরও একই রকম একটি ভাবনা ছিল। ওয়ার্ল্ড ভিশন অস্ট্রেলিয়ার অ্যাম্বাসেডর হিসেবে তিনি করাইল বস্তি সফর করেছিলেন। সেখানে শিশুরা তাকে জিজ্ঞাসা করেছিল, “আমরা কি আপনার মতো হতে পারি?"

প্রশ্নটি মারিয়ামের মনে থেকে যায়। এটি তাকে ভাবায়, সীমিত সুযোগ কীভাবে তরুণদের নিজেদের ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবনাকে প্রভাবিত করতে পারে। তিনি বলেন, “আমরা আমাদের বাংলাদেশি কিশোর তরুন দের কাছে পৌঁছাতে এবং তাদের জন্য কিছু করতে চেয়েছিলাম, এমনকি যদি তা পরোক্ষভাবেও হয়।”

এই ভাবনা থেকেই ভিএঅস "কেসিসি উইংস" -কে ৫,০০০ অস্ট্রেলিয়ান ডলার দান করে। এই অর্থ করাইলের ১০ জন তরুণকে কালিনারি প্রশিক্ষণ, পরামর্শ, ইংরেজি শিক্ষা এবং কর্মজীবনের জন্য প্রস্তুত হতে সহায়তা করে। এই উদ্যোগের কথা বলতে গিয়ে মারিয়াম বলেন, “আমরা বিশ্বাস করি, স্কুলের সম্পর্ক ছাড়িয়ে কমিউনিটি কে বদলে দেবার যে স্বপ্ন নিয়ে আমরা ভিএঅস শুরু করেছিলাম, তা আমাদের কাজের মাধ্যমে এবং আমরা যাদের কে সাহায্য করেছি , তার মধ্য দিয়ে বেঁচে থাকবে।”

বাংলাদেশের সঙ্গে এই সংযোগ এখানেই শেষ নয়। ভিএঅস ২০২৪ সালে বন্যা দূর্গত এলাকায় এবং ২০২৫ সালে এইম স্কুল ফাউন্ডেশন-এর শিক্ষার্থীদের জন্য বেঞ্চ সরবরাহ করায় সাহায্য করস। ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বরে, ভিএঅস এইম ফাউন্ডেশনের ‘স্পনসর এ চাইল্ড’ প্রোজেক্ট এ সহায়তা করছে। এর মাধ্যমে শিশুদের বই, কলম, পেন্সিল এবং অন্যান্য প্রয়োজনীয় শিক্ষাসামগ্রী দেওয়া হচ্ছে। গত পাচ বছরে ভি এ অস এখনো পর্যন্ত ৯২০০০ অস্ট্রেলিয়ার অনুদান তুলে দিয়েছে অস্ট্রেলিয়ার কমিউনিটি তে যা খরচ হয়েছে ডমেস্টিক ভায়োলেন্স শিকার নারীদের শারীরিক আর অর্থনৈতিক উন্নয়নে, সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের জন্য, নারীদের স্বাস্থ্য সুরক্ষায়, কর্মসংস্থান ও আর্থিক ক্ষমতায়নে। 

তাৎক্ষণিক সাহায্য থেকে শুরু করে শিক্ষা, দক্ষতা ও নতুন সুযোগ তৈরি করা পর্যন্ত, ভিএঅস-এর কাজ ধীরে ধীরে আরও বড় পরিসরে ছড়িয়ে পড়েছে। আর এর পেছনে রয়েছে সেই একই বন্ধন, যা একসময় স্কুলের কয়েকজন বন্ধু,  সিনিয়র,  জুনিওর কে আবার একসঙ্গে করেছিল। প্রাক্তনীদের সঙ্গে আবার যোগাযোগ করার একটি ছোট্ট ইচ্ছা থেকে যে যাত্রা শুরু হয়েছিল, তা আজ অনেক বড় একটি কমিউনিটিতে পরিণত হয়েছে। সিডনির একটি ছোট রেস্টুরেন্ট থেকে থেকে শুরু করে অস্ট্রেলিয়ার আটটি অঞ্চলে ছড়িয়ে থাকা একটি দাতব্য সংস্থা, তাদের গল্পটি শুধু
একটি সংগঠনের বড় হয়ে ওঠার গল্প নয়। এটি প্রমান করে দেয় , স্কুলজীবনে তৈরি হওয়া একটা স্পিরিট,  সময়ের সঙ্গে কত মানুষের জীবনে পৌঁছাতে পারে,  জীবন টা পুরো বদলে দিতে পারে।