সংসদকে কার্যকর ও জবাবদিহিমূলক করতে কাজ করছে সরকার
জাতীয় সংসদকে একটি কার্যকর, জবাবদিহিমূলক এবং গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানে পরিণত করতে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বর্তমান সরকার কাজ করছে বলে জানিয়েছেন জাতীয় সংসদের চিফ হুইপ মো. নূরুল ইসলাম।
তিনি বলেছেন, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ আরও প্রাণবন্ত, শক্তিশালী এবং নীতি-নির্ধারণে কার্যকর ভূমিকা পালনকারী প্রতিষ্ঠানে পরিণত হবে।
তিনি আরও বলেন, বর্তমান সংসদ শুধু আইন প্রণয়নের কেন্দ্র নয়, বরং এটি একটি পরিবর্তনশীল গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে গড়ে উঠছে, যা ভবিষ্যতে রাষ্ট্র পরিচালনায় আরও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।
সম্প্রতি জাতীয় সংসদে চিফ হুইপের কার্যালয়ে রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা বাসস’কে দেওয়া এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে চিফ হুইপ এসব কথা বলেন।
মো. নূরুল ইসলাম বলেন, অতীতে জাতীয় সংসদ জনগণের প্রকৃত প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হয়েছিল। তার মতে, সেই সময় সংসদকে কার্যত একটি স্বৈরতান্ত্রিক কাঠামো টিকিয়ে রাখার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হয়, যেখানে প্রকৃত নির্বাচনী প্রতিযোগিতা ও জবাবদিহিতার কোন লেশমাত্র ছিল না।
চিফ হুইপ বলেন, স্বৈরাচারের সময় জাতীয় সংসদ বলতে কিছুই ছিল না। সেই সময় রাতে নির্বাচন হয়েছে, ডামি নির্বাচন হয়েছে, আমি-ডামি নির্বাচন হয়েছে। নানান ধরনের নির্বাচন হয়েছে এবং প্রকৃতপক্ষে সেটা কোনো নির্বাচনই হয়নি। একটা সংসদে সরকার গঠন করতে ১৫১ জন সংসদ সদস্য লাগে। অথচ স্বৈরাচারের সময় ১৫৪ জন এমপি ভোট ছাড়া এমনিতেই পাস করে গেছে । সেরকম সংসদও আমরা দেখেছি। কাজেই ওইসব সংসদকে আর এই সংসদের সাথে তুলনা করলে চলবে না। এই সংসদ একটা গণতান্ত্রিক পরিবেশ তৈরি করার জন্য চেষ্টা করেছে। পার্থক্যটা হলো, তারা একটা স্বৈরতান্ত্রিক সরকার গঠন করেছে ওই সংসদ দিয়ে। আর এই সংসদ দিয়ে আমরা একটা গণতান্ত্রিক পরিবেশ বিনির্মাণ করতে চাই।
সংসদকে প্রাণবন্ত করার আগে সেটিকে কার্যকর করা জরুরি উল্লেখ করে চিফ হুইপ বলেন, কার্যকারিতা নিশ্চিত না হলে প্রাণবন্ততা কেবল আনুষ্ঠানিকতা হয়ে যায়।
তিনি জানান, চলমান অধিবেশনের প্রথম দিকের কয়েকদিনেই ১৩৩টি বিল নিষ্পত্তি করা হয়েছে, যা সংসদীয় ইতিহাসে বিরল ঘটনা। তার মতে, এটি প্রমাণ করে যে সংসদ এখন দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণে সক্ষম।
তিনি আরও বলেন, সংসদের কার্যক্রম এখন শুধুমাত্র সংসদ সদস্যদের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, বরং সংসদ সচিবালয়, কমিটি এবং প্রশাসনিক কাঠামোও সমন্বিতভাবে কাজ করছে। এই সমন্বয়ের ফলেই সংসদের কার্যকারিতা বৃদ্ধি পাচ্ছে।
চিফ হুইপ জানান, বর্তমান সরকারের লক্ষ্য হলো সংসদকে সত্যিকারের ‘জনগণের পার্লামেন্ট’ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা। সরকারের নীতি, উন্নয়ন পরিকল্পনা এবং বাজেট কার্যক্রম সংসদের মাধ্যমে জনগণের কাছে জবাবদিহির আওতায় আনা হচ্ছে। সংসদ সদস্যরা এই জবাবদিহির মূল মাধ্যম হিসেবে কাজ করবেন, আর বিরোধীদল সমালোচনা ও পর্যালোচনার মাধ্যমে ভারসাম্য বজায় রাখবে।
বিরোধীদলের ভূমিকা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, সংসদে বিরোধীদলকে পর্যাপ্ত সময় ও সুযোগ দেওয়া হচ্ছে। তিনি বলেন, অতীতের তুলনায় এখন বিরোধীদল আরও স্বাধীনভাবে বক্তব্য দিতে পারছে এবং সরকারের কার্যক্রমের সমালোচনা করতে পারছে। ‘সমালোচনা গণতন্ত্রের অংশ, আমরা সেটিকে স্বাগত জানাই’ তিনি যোগ করেন।
নতুন সংসদ সদস্যদের বিষয়ে তিনি বলেন, বর্তমান সংসদের একটি বড় অংশই নতুন সংসদ সদস্য। তারা সংসদীয় নিয়ম, রীতি, আইন প্রণয়ন প্রক্রিয়া এবং কার্যপদ্ধতি সম্পর্কে ধীরে ধীরে অভ্যস্ত হচ্ছেন। প্রাথমিক পর্যায়ে কিছুটা অস্থিরতা থাকলেও তা স্বাভাবিক বলে তিনি উল্লেখ করেন। তার মতে, অভিজ্ঞতা অর্জনের সঙ্গে সঙ্গে তারা আরও কার্যকর ভূমিকা রাখতে সক্ষম হবেন।
সংসদের ভেতরে ঐক্যমতের বিষয়গুলো উল্লেখ করে চিফ হুইপ বলেন, কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে সংসদ সদস্যদের মধ্যে ব্যাপক ঐক্য দেখা যাচ্ছে। এর মধ্যে সরকারি প্লট গ্রহণ না করা এবং ট্যাক্স ফ্রি গাড়ি সুবিধা না নেওয়ার মতো সিদ্ধান্ত তিনি উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরেন। তিনি বলেন, এসব সিদ্ধান্ত সংসদের অভ্যন্তরে স্বচ্ছতা ও নৈতিকতার একটি নতুন দৃষ্টান্ত তৈরি করেছে।
কৃষি খাত নিয়ে তিনি বলেন, বর্তমান সরকার কৃষকদের অর্থনৈতিকভাবে শক্তিশালী করতে বহুমুখী উদ্যোগ নিয়েছে। কৃষি কার্ড, ন্যায্যমূল্যে সার বিতরণ, মাটির গুণাগুণ পরীক্ষা এবং ফসলভিত্তিক ডাটাবেজ তৈরির কাজ চলছে। তবে তিনি সতর্ক করে বলেন, এসব উদ্যোগ সফল করতে হলে সময়মতো মানসম্মত সার, বীজ ও কীটনাশক সরবরাহ নিশ্চিত করা জরুরি।
তিনি আরও বলেন, কৃষি খাতে দীর্ঘদিনের কিছু অনিয়ম দূর করতে নতুন করে ডিলার নিয়োগ ও বিতরণ ব্যবস্থার সংস্কার করা হচ্ছে। পুরোনো কাঠামোর কারণে কৃত্রিম সংকট তৈরি হয়েছিল বলে তিনি উল্লেখ করেন।
অর্থনীতি ও রাষ্ট্র পরিচালনার প্রসঙ্গে চিফ হুইপ বলেন, সরকার ভর্তুকি, জ্বালানি মূল্য নিয়ন্ত্রণ এবং জনকল্যাণমূলক প্রকল্পের মাধ্যমে জনগণের ওপর চাপ কমাতে কাজ করছে। তার ভাষায়, রাষ্ট্রের অর্থ যেন সরাসরি জনগণের কল্যাণে ব্যবহার হয়, সেটাই বর্তমান সরকারের মূল লক্ষ্য।
জুলাই সনদ বাস্তবায়ন প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এ বিষয়ে সংবিধান সংশোধনের প্রয়োজন হতে পারে। বিভিন্ন অধ্যাদেশ ও নীতিমালা পর্যালোচনা করে একটি শক্তিশালী আইন প্রণয়নের পরিকল্পনা রয়েছে। কিছু বিষয় বিশেষ কমিটিতে আলোচনা শেষে চূড়ান্ত করা হবে বলে তিনি জানান।