নিয়োগপ্রক্রিয়া শুরুর ঘোষণা, কর্মী বাছাই ও বিএমইটি ছাড়পত্রে নিজস্ব লাইসেন্স ব্যবহারের সুযোগ; মেডিকেল সেন্টার অনুমোদনে চলছে যাচাই
মালয়েশিয়ার শ্রমবাজারে বাংলাদেশি কর্মী নিয়োগের প্রক্রিয়া শুরুর ঘোষণা দিয়েছে সরকার। নতুন ব্যবস্থায় দেশটির কর্তৃপক্ষের তালিকাভুক্ত ৩৩৮টি বাংলাদেশি রিক্রুটিং এজেন্সি কর্মী পাঠানোর সুযোগ পাবে। পাশাপাশি বাংলাদেশের বিশেষ অনুরোধে ১০ হাজার কর্মীকে সম্পূর্ণ বিনা খরচে নিয়োগের বিষয়ে নীতিগতভাবে সম্মত হয়েছে মালয়েশিয়া।
সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, নতুন ব্যবস্থায় বৈধ ও যোগ্য রিক্রুটিং এজেন্সিগুলো নিজেরাই মালয়েশিয়া থেকে নিয়োগচাহিদা সংগ্রহ, কর্মী নির্বাচন এবং নিজস্ব লাইসেন্সের অধীনে জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) ছাড়পত্রের প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে পারবে। অন্যদিকে, ভিসাসহ প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক প্রক্রিয়ায় বাংলাদেশ ওভারসিজ এমপ্লয়মেন্ট অ্যান্ড সার্ভিসেস লিমিটেড (বোয়েসেল) এবং তালিকাভুক্ত ২৫টি প্রসেসিং ও সার্ভিস এজেন্সি সহায়তা করবে।
সরকারের এই উদ্যোগের লক্ষ্য হলো মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার পুনরায় কার্যকর করা, নিয়োগে প্রতিযোগিতা বাড়ানো এবং অভিবাসন ব্যয় কমিয়ে কর্মীদের স্বার্থ সুরক্ষিত রাখা।
সরকারি তথ্য অনুযায়ী, মালয়েশিয়ার মানবসম্পদ মন্ত্রণালয়ের নির্ধারিত যোগ্যতার ভিত্তিতে বাংলাদেশের একটি সরকারি রিক্রুটিং এজেন্সি বোয়েসেল, ২৫টি বেসরকারি প্রসেসিং ও সার্ভিস এজেন্সি এবং ৩১২টি রিক্রুটিং এজেন্সিকে তালিকাভুক্ত করতে সম্মত হয়েছে মালয়েশিয়ার কর্তৃপক্ষ।
এর আগে ২০২২ সালের ১৮ ডিসেম্বর দুই দেশের মধ্যে স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) অনুযায়ী, মালয়েশিয়ার নির্ধারিত শর্তে বাংলাদেশের রিক্রুটিং এজেন্সিগুলোর যোগ্যতা যাচাইয়ের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছিল। অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে প্রয়োজনীয় কাগজপত্রসহ ৪২৩টি এজেন্সির তালিকা মালয়েশিয়ার কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানো হয়।
বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর শ্রমবাজার পুনরায় চালু এবং নিয়োগপ্রক্রিয়ায় বাংলাদেশের বৈধ এজেন্সিগুলোর অংশগ্রহণ বাড়াতে মালয়েশিয়ার সঙ্গে আলোচনা অব্যাহত রাখে। এ ক্ষেত্রে মালয়েশিয়ার নিজস্ব নীতিমালা ও বিদ্যমান সমঝোতা স্মারকের শর্তের পাশাপাশি বাংলাদেশের এজেন্সিগুলোর জন্য সুযোগ সম্প্রসারণের বিষয়টি গুরুত্ব পায়।
নতুন ব্যবস্থায় মালয়েশিয়ার কর্তৃপক্ষের তালিকাভুক্ত রিক্রুটিং এজেন্সিগুলো নিজেদের উদ্যোগে দেশটির নিয়োগকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করে চাকরির চাহিদাপত্র বা জব অর্ডার সংগ্রহ করতে পারবে। এরপর বাংলাদেশের প্রচলিত আইন ও বিধি অনুসরণ করে নিজেরাই কর্মী নির্বাচন ও নিয়োগের কার্যক্রম পরিচালনা করবে।
ভিসা ও অন্যান্য প্রশাসনিক প্রক্রিয়ায় সহায়তা দেবে বোয়েসেলসহ তালিকাভুক্ত ২৫টি প্রসেসিং ও সার্ভিস এজেন্সি। প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ার পর সংশ্লিষ্ট রিক্রুটিং এজেন্সি নিজস্ব লাইসেন্সের অধীনে কর্মীদের বিএমইটি ছাড়পত্রের ব্যবস্থা করতে পারবে।
এ ব্যবস্থায় জব অর্ডার সংগ্রহ, কর্মী নির্বাচন ও নিয়োগের দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট রিক্রুটিং এজেন্সির হাতে থাকবে। প্রশাসনিক প্রক্রিয়ায় সহায়তাকারী সংস্থাগুলো প্রয়োজনীয় অনাপত্তিপত্রও দিতে পারবে বলে সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।
নতুন ব্যবস্থার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, বাংলাদেশের বিশেষ অনুরোধে ১০ হাজার কর্মীকে সম্পূর্ণ বিনা খরচে নিয়োগের বিষয়ে মালয়েশিয়ার কর্তৃপক্ষ নীতিগতভাবে সম্মত হয়েছে।
সরকারের লক্ষ্য, কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরির পাশাপাশি কর্মীদের ওপর অতিরিক্ত আর্থিক চাপ কমানো। তবে এই ১০ হাজার কর্মী কোন খাতে নিয়োগ পাবেন, কখন তাঁদের পাঠানো হবে এবং শূন্য অভিবাসন ব্যয়ের আওতায় কোন কোন খরচ অন্তর্ভুক্ত থাকবে, সে বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য দেওয়া হয়নি।
সরকার রিক্রুটিং এজেন্সিগুলোকে আইন মেনে কার্যক্রম পরিচালনা এবং কর্মীদের আর্থিক স্বার্থ সুরক্ষার আহ্বান জানিয়েছে।
মালয়েশিয়াগামী কর্মীদের স্বাস্থ্য পরীক্ষার জন্য অনুমোদিত মেডিকেল সেন্টারের তালিকা চূড়ান্ত করার প্রক্রিয়া এখনো চলমান। বিদ্যমান সমঝোতা স্মারক অনুযায়ী, এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়া—উভয় দেশের দায়িত্ব রয়েছে।
সরকারের তথ্য অনুযায়ী, শ্রমবাজার দ্রুত চালুর স্বার্থে বাংলাদেশ বিদ্যমান মেডিকেল সেন্টারের তালিকা পরিবর্তনের অনুরোধ জানিয়েছিল। তবে মালয়েশিয়ার স্বাস্থ্য, মানবসম্পদ ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের যৌথ প্রতিনিধি দলের সরেজমিন পরিদর্শনের পর পূর্ণাঙ্গ তালিকা চূড়ান্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে।
এর মধ্যে মালয়েশিয়া সরকারের অনুরোধ ও বাংলাদেশের প্রস্তাবের ভিত্তিতে বিতর্কিত এবং অনিয়মের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট মেডিকেল সেন্টার বাদ দিয়ে দেশটির সংশ্লিষ্ট ওয়েবসাইটে তালিকাভুক্ত অবশিষ্ট কেন্দ্রগুলোর মাধ্যমে কার্যক্রম শুরুর সিদ্ধান্ত হয়েছে বলে জানানো হয়েছে।
পরবর্তী সময়ে মালয়েশিয়ার তিন মন্ত্রণালয়ের প্রতিনিধি দল বাংলাদেশে এসে নতুন নীতিমালার আলোকে মেডিকেল সেন্টারগুলো যাচাই করবে। নতুন কোনো কেন্দ্র অনুমোদন পেলে তা সংশ্লিষ্ট ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হবে এবং বাংলাদেশের প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ও তালিকা জানাবে।
সরকার বলছে, কোনো মেডিকেল সেন্টারে অনিয়ম পাওয়া গেলে বাংলাদেশের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ তার কার্যক্রম বন্ধের ব্যবস্থা নেবে। পাশাপাশি কোনো একটি নির্দিষ্ট মেডিকেল সেন্টারকে এককভাবে স্বাস্থ্য পরীক্ষা পরিচালনার সুযোগ দেওয়া হবে না।
মালয়েশিয়ায় যেতে আগ্রহী কর্মীদের জন্য নিয়োগপ্রক্রিয়া শুরুর ঘোষণা দিয়ে সরকার জানিয়েছে, তাঁরা তালিকাভুক্ত ও অনুমোদিত রিক্রুটিং এজেন্সির মাধ্যমে নিয়োগের প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে পারবেন। স্বাস্থ্য পরীক্ষাও করাতে হবে অনুমোদিত মেডিকেল সেন্টার থেকে।
সরকারের প্রত্যাশা, নতুন ব্যবস্থায় আরও বেশি বৈধ এজেন্সির অংশগ্রহণ নিশ্চিত হবে, নিয়োগপ্রক্রিয়ায় একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ কমবে এবং কর্মীদের জন্য মালয়েশিয়ায় যাওয়ার সুযোগ বাড়বে।
বাংলাদেশের বৈদেশিক কর্মসংস্থানের অন্যতম প্রধান গন্তব্য মালয়েশিয়া। দেশটিতে কর্মরত বাংলাদেশিরা দুই দেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছেন। তাই শ্রমবাজার পুনরায় কার্যকর করার পাশাপাশি নিয়োগে স্বচ্ছতা, অভিবাসন ব্যয় নিয়ন্ত্রণ এবং কর্মীদের অধিকার সুরক্ষাকে দীর্ঘমেয়াদি শ্রম সহযোগিতার গুরুত্বপূর্ণ শর্ত হিসেবে দেখছে সরকার।
এই উদ্যোগ বাস্তবায়নে মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী, দেশটির মানবসম্পদ মন্ত্রণালয় ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সহযোগিতার জন্য কৃতজ্ঞতা জানিয়েছে বাংলাদেশ সরকার। এখন নিয়োগপ্রক্রিয়া বাস্তবে কত দ্রুত শুরু হয় এবং কর্মীদের জন্য ব্যয় ও হয়রানি কতটা কমানো যায়, তা-ই হবে এই উদ্যোগের সাফল্যের গুরুত্বপূর্ণ মাপকাঠি।