Favicon

আগামী বাজেটে আবাসন খাতে টেকসই নীতিগত সহায়তা সহায়তা চাইলেন রিহ্যাব প্রেসিডেন্ট

প্রতিবেদক: মাজহারুল ইসলাম মিচেল জুন ১০, ২০২৬, ২:৩৪ অপরাহ্ণ বিভাগ: এক্সক্লুসিভ
আগামী বাজেটে আবাসন খাতে টেকসই নীতিগত সহায়তা সহায়তা চাইলেন রিহ্যাব প্রেসিডেন্ট
Photo : Courtesy
আবাসন খাতকে টেকসই ও গতিশীল রাখতে কিছু নীতিগত সহায়তা অত্যন্ত জরুরি

বাংলাদেশের অর্থনীতিতে আবাসন খাত একটি গুরুত্বপূর্ণ চালিকাশক্তি। প্রায় ২৬৯টি লিংকেজ শিল্পের সঙ্গে সম্পৃক্ত এই খাত শুধু আবাসন নির্মাণই করে না, বরং কর্মসংস্থান, শিল্প উৎপাদন, বিনিয়োগ এবং সরকারি রাজস্ব বৃদ্ধিতেও উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখে। জাতীয় বাজেট ২০২৬-২৭ ঘোষণার প্রাক্কালে আবাসন খাতের প্রত্যাশা, চ্যালেঞ্জ এবং করণীয় নিয়ে কথা বলেছেন রিহ্যাব প্রেসিডেন্ট ড. আলী আফজাল।

প্রশ্ন ১: বাজেট ঘোষণার দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে আবাসন খাতের সবচেয়ে বড় প্রত্যাশা কী?

ড. আলী আফজাল:
বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতায় আবাসন খাতকে টেকসই ও গতিশীল রাখতে কিছু নীতিগত সহায়তা অত্যন্ত জরুরি। আমাদের প্রধান দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে ফ্ল্যাট নিবন্ধন ব্যয় কমানো, আবাসন ঋণে এক অঙ্কের সুদ নিশ্চিত করা, মধ্যবিত্তের জন্য বিশেষ গৃহঋণ তহবিল গঠন, নির্মাণসামগ্রীর ওপর কর হ্রাস, আবাসন খাতে অতিরিক্ত কর ও ভ্যাটের বোঝা কমানো এবং প্রবাসী ও দেশীয় বিনিয়োগ উৎসাহিত করা।

আমরা কোনো বিশেষ সুবিধা চাই না। আমরা চাই এমন একটি নীতিগত পরিবেশ, যা সাধারণ মানুষের আবাসন প্রাপ্তি সহজ করবে এবং একই সঙ্গে অর্থনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ খাতকে সচল রাখবে।

 প্রশ্ন ২: অনেকেই বলেন আবাসন খাত শুধু ডেভেলপারদের ব্যবসা। আপনি কেন এটিকে জাতীয় অর্থনীতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ মনে করেন?

ড. আলী আফজাল:
আবাসন খাতকে শুধু একটি ব্যবসায়িক খাত হিসেবে দেখলে ভুল হবে। একটি ভবন নির্মাণের সঙ্গে রড, সিমেন্ট, ইট, কাচ, সিরামিক, লিফট, বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম, পরিবহন, ব্যাংকিং, বীমা, স্থাপত্য ও প্রকৌশল সেবাসহ শত শত শিল্প ও সেবা খাত জড়িত।

একটি ফ্ল্যাট বিক্রির মাধ্যমে যে অর্থ প্রবাহিত হয়, তা পর্যায়ক্রমে অসংখ্য খাতে ছড়িয়ে পড়ে। অর্থনীতিতে এই বহুমাত্রিক প্রভাবের কারণেই আবাসন খাতকে ‘মাল্টিপ্লায়ার ইফেক্ট’ সৃষ্টিকারী খাত বলা হয়। আবাসন খাত সচল থাকলে শিল্প সচল থাকে, কর্মসংস্থান বাড়ে, রাজস্ব বাড়ে এবং সামগ্রিক অর্থনীতি গতিশীল হয়।

 প্রশ্ন ৩: ফ্ল্যাট নিবন্ধন ব্যয় কমানোর দাবি বারবার আসছে। এটি কেন এত গুরুত্বপূর্ণ?

ড. আলী আফজাল:
বাংলাদেশে ফ্ল্যাট ক্রয়ের পর নিবন্ধন, স্ট্যাম্প ডিউটি, উৎসে কর এবং অন্যান্য চার্জ মিলিয়ে ক্রেতাকে উল্লেখযোগ্য অতিরিক্ত ব্যয় বহন করতে হয়। এতে অনেক সম্ভাব্য ক্রেতা শেষ পর্যন্ত ফ্ল্যাট কেনার সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসেন।

আমাদের বিশ্বাস, নিবন্ধন ব্যয় যৌক্তিক পর্যায়ে নামিয়ে আনা হলে লেনদেনের পরিমাণ বাড়বে। এতে সরকার কম হারে কর নিয়েও বেশি সংখ্যক লেনদেন থেকে অধিক রাজস্ব পাবে। অর্থাৎ করের হার কমলেও রাজস্ব কমবে না; বরং অর্থনৈতিক কার্যক্রম বাড়ার কারণে রাজস্ব বাড়ার সুযোগ তৈরি হবে।

প্রশ্ন ৪: আবাসন ঋণে এক অঙ্কের সুদের দাবি কতটা বাস্তবসম্মত?

ড. আলী আফজাল:
অবশ্যই বাস্তবসম্মত। বাসস্থান কোনো বিলাসিতা নয়, এটি মানুষের মৌলিক প্রয়োজন। বর্তমানে উচ্চ সুদের কারণে মধ্যবিত্ত মানুষের জন্য ফ্ল্যাট কেনা কঠিন হয়ে পড়েছে। আবাসন ঋণের কিস্তি অনেক পরিবারের আয়-সামর্থ্যের বাইরে চলে যাচ্ছে।

বিশ্বের বিভিন্ন দেশে আবাসন খাতকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে দীর্ঘমেয়াদি ও স্বল্পসুদে গৃহঋণের ব্যবস্থা রয়েছে। বাংলাদেশেও যদি এক অঙ্কের সুদে আবাসন ঋণ নিশ্চিত করা যায়, তাহলে লাখো পরিবার উপকৃত হবে এবং আবাসন বাজারে নতুন গতি ফিরে আসবে।

প্রশ্ন ৫: মধ্যবিত্তের জন্য বিশেষ গৃহঋণ তহবিলের প্রয়োজনীয়তা কতটা?

ড. আলী আফজাল:
আমাদের দেশে সবচেয়ে বড় আবাসন চাহিদা মধ্যবিত্ত শ্রেণির মধ্যে। কিন্তু তারাই বর্তমানে সবচেয়ে বেশি চাপে রয়েছে। জমির দাম, নির্মাণ ব্যয় এবং ঋণের সুদ—সবকিছু মিলিয়ে তাদের জন্য নিজস্ব আবাসনের স্বপ্ন বাস্তবায়ন কঠিন হয়ে যাচ্ছে।

আমরা চাই একটি বিশেষ গৃহঋণ তহবিল গঠন করা হোক, যেখানে মধ্যবিত্ত পরিবার দীর্ঘমেয়াদে সহজ শর্তে ঋণ পাবে। এটি শুধু সামাজিক কল্যাণ নয়; বরং অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড সম্প্রসারণেরও একটি কার্যকর উপায়।

প্রশ্ন ৬: নির্মাণসামগ্রীর ওপর কর কমানোর দাবি কতটা যৌক্তিক?

ড. আলী আফজাল:
নির্মাণসামগ্রীর মূল্য বৃদ্ধি সরাসরি ফ্ল্যাটের দামের ওপর প্রভাব ফেলে। বর্তমানে রড, সিমেন্ট, কাচ, সিরামিকসহ প্রায় সব ধরনের উপকরণের মূল্য বেড়েছে। এর সঙ্গে কর ও শুল্কের বিষয়ও যুক্ত রয়েছে।

যখন উৎপাদন ব্যয় বাড়ে, তখন শেষ পর্যন্ত সেই চাপ সাধারণ ক্রেতার ওপর গিয়ে পড়ে। ফলে আবাসন ক্রয়ক্ষমতার বাইরে চলে যায়। কর কাঠামো যৌক্তিক করা গেলে নির্মাণ ব্যয় কমবে এবং আবাসন আরও মানুষের নাগালে আসবে।

প্রশ্ন ৭: অপ্রদর্শিত অর্থ বিনিয়োগের সুযোগ এবং একই সঙ্গে কর কমিয়ে অপ্রদর্শিত অর্থের উৎস বন্ধ করার কথা বলছেন। বিষয়টি কীভাবে দেখেন?

ড. আলী আফজাল:
আমাদের অবস্থান অত্যন্ত স্পষ্ট। অর্থনীতিতে স্থবির হয়ে থাকা অর্থকে উৎপাদনশীল খাতে নিয়ে আসা প্রয়োজন। আবাসন খাত সেই সুযোগ দিতে পারে। তবে এটি দীর্ঘমেয়াদি সমাধান নয়।

দীর্ঘমেয়াদে এমন করব্যবস্থা প্রয়োজন, যেখানে করহার যৌক্তিক হবে, কর প্রদান সহজ হবে এবং মানুষ স্বেচ্ছায় কর প্রদানে উৎসাহিত হবে। করের বোঝা অতিরিক্ত হলে মানুষ কর ফাঁকির পথ খোঁজে, কিন্তু করহার যৌক্তিক হলে রাজস্ব আদায়ও বাড়ে এবং অপ্রদর্শিত অর্থ সৃষ্টির প্রবণতাও কমে।

প্রশ্ন ৮: কাল বাজেট ঘোষণা হবে। শেষ মুহূর্তে আপনারা কি আশাবাদী যে এসব দাবি অন্তর্ভুক্ত হবে?

ড. আলী আফজাল:
আমরা অবশ্যই আশাবাদী। তবে বাজেট ঘোষণার দিনই সবকিছুর শেষ নয়। জাতীয় বাজেট সংসদে উপস্থাপনের পর বিভিন্ন অংশীজনের মতামত নেওয়া হয় এবং চূড়ান্তভাবে বাজেট পাস হতে সাধারণত কয়েক সপ্তাহ সময় থাকে।

আমরা বিশ্বাস করি, সরকার অর্থনীতির বৃহত্তর স্বার্থ বিবেচনা করে আবাসন খাতের যৌক্তিক দাবিগুলো গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করবে। এমনকি বাজেট উপস্থাপনের পরও আলোচনা ও পর্যালোচনার মাধ্যমে প্রয়োজনীয় সংশোধন বা সংযোজনের সুযোগ থাকে। তাই আমরা শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত ইতিবাচক প্রত্যাশা রাখছি।

প্রশ্ন ৯: এক বাক্যে সরকারের কাছে রিহ্যাবের বার্তা কী?

ড. আলী আফজাল:
আবাসন খাতকে ব্যয়বহুল নয়, প্রবৃদ্ধিবান্ধব খাত হিসেবে বিবেচনা করা হোক। কারণ আবাসনে বিনিয়োগ মানেই কর্মসংস্থান, শিল্পায়ন, নগর উন্নয়ন, রাজস্ব বৃদ্ধি এবং মধ্যবিত্ত মানুষের আবাসন স্বপ্ন বাস্তবায়ন। একটি সহায়ক করনীতি ও সহজ অর্থায়ন ব্যবস্থা পুরো অর্থনীতিকেই উপকৃত করবে।


বিষয়বস্তু মূল দাবি / বাস্তবতা জাতীয় অর্থনীতিতে প্রভাব ও যৌক্তিকতা
প্রধান প্রত্যাশা

* ফ্ল্যাট নিবন্ধন ব্যয় হ্রাস


* আবাসন ঋণে এক অঙ্কের (Single digit) সুদ


* মধ্যবিত্তের জন্য বিশেষ গৃহঋণ তহবিল


* নির্মাণসামগ্রীর ওপর কর ও ভ্যাট কমানো

* বিশেষ সুবিধা নয়, বরং সাধারণ মানুষের আবাসন প্রাপ্তি সহজ করা এবং আবাসন খাতকে সচল রাখা।
অর্থনৈতিক গুরুত্ব

* ২৬৯টি লিংকেজ শিল্পের সঙ্গে সম্পৃক্ত (রড, সিমেন্ট, ইট, সিরামিক, ব্যাংকিং ইত্যাদি)


* 'মাল্টিপ্লায়ার ইফেক্ট' সৃষ্টিকারী খাত

* অর্থ পর্যায়ক্রমে অসংখ্য খাতে ছড়িয়ে পড়ে।


* শিল্প সচল রাখে, কর্মসংস্থান বাড়ায় এবং সামগ্রিক অর্থনীতি গতিশীল করে।

নিবন্ধন ব্যয় হ্রাস * বর্তমানে নিবন্ধন, স্ট্যাম্প ডিউটি ও উৎসে করের কারণে অতিরিক্ত ব্যয় গুনতে হয়।

* ব্যয় যৌক্তিক হলে ফ্ল্যাট কেনাবেচা (লেনদেন) বাড়বে।


* করের হার কমলেও বেশি লেনদেনের কারণে সরকারের রাজস্ব বৃদ্ধি পাবে

এক অঙ্কের আবাসন ঋণ * বর্তমান উচ্চ সুদের হার মধ্যবিত্তের আয়-সামর্থ্যের বাইরে।

* বাসস্থান মৌলিক অধিকার।


* স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদি ঋণের সুবিধা দিলে লাখো পরিবার উপকৃত হবে এবং বাজারে গতি ফিরবে।

মধ্যবিত্তের গৃহঋণ তহবিল * জমির দাম, নির্মাণ ব্যয় ও ঋণের সুদের কারণে মধ্যবিত্তরা সবচেয়ে বেশি চাপে আছে। * দীর্ঘমেয়াদে সহজ শর্তে ঋণ দিলে সামাজিক কল্যাণের পাশাপাশি অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের সম্প্রসারণ ঘটবে।
নির্মাণসামগ্রীর কর * রড, সিমেন্ট, কাচসহ সব উপকরণের মূল্য ও কর বৃদ্ধি পেয়েছে। * উৎপাদন ব্যয় বাড়লে ফ্ল্যাটের দাম বাড়ে। কর কাঠামো যৌক্তিক করলে আবাসন মানুষের নাগালে আসবে।
অপ্রদর্শিত অর্থ ও কর নীতি * স্থবির হয়ে থাকা অর্থ আবাসন খাতে বিনিয়োগের সুযোগ দেওয়া। * দীর্ঘমেয়াদে করহার যৌক্তিক ও সহজ করা প্রয়োজন, যাতে মানুষ কর ফাঁকি না দিয়ে স্বেচ্ছায় কর দেয়।
বাজেট ও রিহ্যাবের বার্তা * বাজেট পাসের চূড়ান্ত মুহূর্ত পর্যন্ত ইতিবাচক সংশোধনীর আশা। * "আবাসন খাতকে ব্যয়বহুল নয়, প্রবৃদ্ধিবান্ধব খাত হিসেবে বিবেচনা করা হোক।"