‘মেড ইন বাংলাদেশ’ অনার স্মার্টফোন: উৎপাদন বাড়িয়ে রপ্তানির স্বপ্ন ও বাংলাদেশের প্রযুক্তি শিল্পের ভবিষ্যৎ
দেশের প্রযুক্তি ও ইলেকট্রনিকস শিল্পে নতুন সম্ভাবনার নাম হয়ে উঠছে ‘মেড ইন বাংলাদেশ’ স্মার্টফোন উৎপাদন।
আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ড অনারের স্থানীয় উৎপাদন কার্যক্রম ঘিরে শিল্প খাতে যেমন আশাবাদ তৈরি হয়েছে, তেমনি প্রশ্ন উঠছে এই উদ্যোগ কি কেবল ফোন সংযোজনেই সীমাবদ্ধ থাকবে, নাকি বাংলাদেশ সত্যিকারের স্মার্টফোন ম্যানুফ্যাকচারিং হাবে পরিণত হওয়ার পথে হাঁটছে?
সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, উৎপাদন ক্ষমতা বাড়ানো, নতুন প্রোডাকশন লাইন স্থাপন এবং ভবিষ্যৎ রপ্তানি পরিকল্পনাকে কেন্দ্র করে বড় ধরনের প্রস্তুতি চলছে।
অনারের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. জহিরুল ইসলাম জানান, প্রাথমিক পর্যায়ে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ১,৫০০ ইউনিট স্মার্টফোন উৎপাদনের লক্ষ্য নিয়ে কার্যক্রম শুরু হয়েছে। বর্তমানে মূলত ফোন অ্যাসেম্বলিং বা সংযোজনের কাজ করা হলেও আগামী এক বছরের মধ্যে উৎপাদন সক্ষমতা কয়েকগুণ বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে। সে লক্ষ্যে আরও চারটি নতুন প্রোডাকশন লাইন স্থাপনের প্রস্তুতি চলছে।
তিনি আরও বলেন, আর এ নতুন প্রোডাকশন লাইন যুক্ত হলে আমাদের বার্ষিক উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা দাঁড়াবে প্রায় ৫ লক্ষাধিক ইউনিটে।
অনারের মহাব্যবস্থাপক আব্দুল্লাহ্ আল মামুন বলেন, ‘মেড ইন বাংলাদেশ’ অনার ফোন দিয়ে আমরা শুধু দেশের চাহিদা মেটাতে চাই না বরং ভবিষ্যতে দক্ষিণ এশিয়া এবং পার্শ্ববর্তী দেশগুলোতে রপ্তানি করার একটি পরিকল্পনা আমাদের রয়েছে।
প্রাথমিক পর্যায়ে দক্ষিণ এশিয়ার নেপাল, ভুটান, শ্রীলংকাতে রপ্তানি করার লক্ষ্য রয়েছে বলে তিনি জানান।
প্রযুক্তি খাত সংশ্লিষ্টদের মতে, বাংলাদেশে স্মার্টফোন বাজার দ্রুত সম্প্রসারিত হচ্ছে। দেশের তরুণ জনগোষ্ঠী, মোবাইল ইন্টারনেট ব্যবহার বৃদ্ধি এবং ডিজিটাল সেবার প্রসারের কারণে স্মার্টফোনের চাহিদা প্রতি বছর বাড়ছে। ফলে স্থানীয় উৎপাদনকারীরা এখন কেবল বাজার দখলের প্রতিযোগিতায় নয় বরং প্রযুক্তিগত সক্ষমতা অর্জনের দিকেও মনোযোগ দিচ্ছে।
অ্যাসেম্বলিং থেকে পূর্ণাঙ্গ উৎপাদনে যাওয়ার প্রস্তুতি
বর্তমানে কারখানায় মূলত বিদেশ থেকে আমদানি করা যন্ত্রাংশ সংযোজন করে স্মার্টফোন তৈরি করা হচ্ছে। তবে কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, আগামী ছয় মাসের মধ্যে পূর্ণাঙ্গ ম্যানুফ্যাকচারিং বা সম্পূর্ণ উৎপাদন ব্যবস্থায় যাওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। এ জন্য ইতোমধ্যে আধুনিক যন্ত্রপাতি স্থাপন, প্রযুক্তিগত দক্ষতা উন্নয়ন এবং স্থানীয় সাপ্লাই চেইন তৈরির কাজ এগিয়ে চলছে।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, পূর্ণাঙ্গ ম্যানুফ্যাকচারিংয়ে যেতে হলে শুধু অ্যাসেম্বলি লাইন থাকলেই হয় না; প্রয়োজন হয় উন্নত মান নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা, সারফেস মাউন্ট টেকনোলজি, চিপসেট ইন্টিগ্রেশন, ব্যাটারি ও অন্যান্য কম্পোনেন্ট উৎপাদনের সক্ষমতা। এ ছাড়া আন্তর্জাতিক মান বজায় রাখতে দক্ষ প্রকৌশলী ও প্রশিক্ষিত জনবলও অপরিহার্য।
অনারের মহাব্যবস্থাপক মামুন দাবি করেন, স্থানীয় প্রকৌশলী ও টেকনিশিয়ানদের আন্তর্জাতিক মানে দক্ষ করে তুলতে বিশেষ প্রশিক্ষণ কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে। বিদেশি বিশেষজ্ঞদের মাধ্যমে হাতে-কলমে প্রশিক্ষণ দেওয়ার পাশাপাশি আধুনিক উৎপাদন প্রযুক্তি ব্যবহারের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, আমাদের কারখানায় এআই-সমর্থিত অটোমেশন ব্যবহার করা হচ্ছে যা প্রতিটি ফোনের হার্ডওয়্যার টেস্টিং এবং সফটওয়্যার ক্যালিব্রেশন নিখুঁতভাবে সম্পন্ন করে। উদাহরণস্বরূপ, ক্যামেরা ফোকাস এবং ব্যাটারি এফিসিয়েন্সি চেক করার জন্য আমরা উন্নত এআই সেন্সর ব্যবহার করি।
গ্লোবাল স্ট্যান্ডাড রক্ষার্থে চীনের কারখানার মতোই এখানে ‘জিরো ডিফেক্ট’ পলিসি অনুসরণ করা হচ্ছে। প্রতিটি ডিভাইস আন্তর্জাতিক ও বাংলাদেশ টেলিকমিউনুকেশন রেগুলেটরি অথরিটির মানদণ্ড অনুযায়ী কোয়ালিটি কন্ট্রোল মানদণ্ড পার করে গ্রাহকের হাতে পৌঁছায় বলে তিনি জানিয়েছেন।
তবে বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেছেন, পূর্ণাঙ্গ ম্যানুফ্যাকচারিংয়ে যেতে হলে স্থানীয়ভাবে যন্ত্রাংশ উৎপাদন বাড়ানো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অন্যথায় ‘মেড ইন বাংলাদেশ’ ট্যাগ থাকলেও প্রকৃত মূল্য সংযোজন সীমিত থেকে যেতে পারে। বর্তমানে অধিকাংশ গুরুত্বপূর্ণ কম্পোনেন্ট বিদেশ থেকে আমদানি করা হয়, যা উৎপাদন ব্যয় বাড়ানোর পাশাপাশি বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ সৃষ্টি করে।
রপ্তানি বাজার ধরার কৌশল
অনারের জেষ্ঠ্য বিপণন ব্যবস্থাপক ফারুক হাসান জানান, কারখানার দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনার বড় অংশজুড়ে রয়েছে রপ্তানি সম্ভাবনা। ভবিষ্যতে বাংলাদেশে উৎপাদিত অনার স্মার্টফোন পার্শ্ববর্তী দেশসহ আন্তর্জাতিক বাজারে রপ্তানির লক্ষ্য রয়েছে। সম্ভাব্য বাজার হিসেবে দক্ষিণ এশিয়া, মধ্যপ্রাচ্য ও আফ্রিকার কয়েকটি দেশের কথা বিবেচনায় নেওয়া হচ্ছে।
বেসিসের (বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন ওফ সফটওয়্যার অ্যান্ড ইনফরমেশন সার্ভিসেস) সাবেক সভাপতি ও বিশিষ্ট প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ সৈয়দ আলমাস কবিরের মতে, বাংলাদেশে উৎপাদিত স্মার্টফোন যদি আন্তর্জাতিক মান বজায় রাখতে পারে, তবে আঞ্চলিক বাজারে প্রতিযোগিতা করার পাশাপশি বিদেশে রপ্তনির সুযোগ তৈরি করতে হবে। তা না হলে ওই কোম্পানি টিকতে পাড়বে না। এজন্য সরকারের প্রযুক্তি শিল্পের কর-সুবিধা ও নীতিগত সহায়তা দিতে হবে। যাতে বিদেশি ব্র্যান্ডগুলো স্থানীয় উৎপাদনে আগ্রহ দেখায়।
তিনি আরও সহজ করে ও ব্যখ্যা দিয়ে বলেন, বর্তমানে যদি কোন কোম্পানি রপ্তানি করতে চায় তাহলে তাকে ৩০% মূল্য সংযোজন পণ্য দেখাতে হয়। যেটা ব্যবসায়িক পরিবেশকে বাধা সৃষ্টি করে। সরকারকে এ মুহুর্তে এটিকে আগামী কয়েক বছরের জন্য ৫% এ কমিয়ে আনার পরামর্শ দেন।
সেই সঙ্গে কাচামাল আমদানির ক্ষেত্রে শুল্ককে একদম নাম মাত্রতে আনতে হবে। যাতে দেশেই উৎপাদনের পরে সেটা বিদেশের থেকে অনেক কমে পাওয়া যায়। তানা হলে রপ্তানিমুখি শিল্প তৈরি হবে না বলেও তিনি হুশিয়ারি করেন।
আর তাহলেই নিরবচ্ছিন্ন গুণগত মান, দ্রুত সরবরাহ ব্যবস্থা এবং শক্তিশালী বিক্রয়োত্তর সেবা দেওয়ার মাধ্যমে রপ্তানি বাজারে প্রবেশ সহজ হবে বলে তিনি মনে করছেন।
প্রযুক্তি শিল্পে নতুন সম্ভাবনা
বাংলাদেশে স্থানীয়ভাবে স্মার্টফোন উৎপাদন বাড়ার ফলে কর্মসংস্থান, দক্ষতা উন্নয়ন এবং প্রযুক্তি নির্ভর শিল্পায়নে ইতিবাচক প্রভাব পড়বে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। বিশেষ করে তরুণদের জন্য নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হবে। পাশাপাশি প্রযুক্তি খাতে বিদেশি বিনিয়োগও বাড়তে পারে।
শিল্প বিশ্লেষকদের মতে, যদি পরিকল্পনা অনুযায়ী পূর্ণাঙ্গ উৎপাদন ও রপ্তানি কার্যক্রম বাস্তবায়িত হয়, তবে বাংলাদেশ ধীরে ধীরে দক্ষিণ এশিয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ ইলেকট্রনিকস ম্যানুফ্যাকচারিং হাবে পরিণত হতে পারে। তবে এর জন্য প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদী নীতি সহায়তা, প্রযুক্তিগত বিনিয়োগ এবং স্থানীয় শিল্পের সক্ষমতা বাড়ানো।
‘মেড ইন বাংলাদেশ’ অনার স্মার্টফোন প্রকল্প এখন তাই শুধু একটি কারখানার ব্যবসায়িক উদ্যোগ নয়; বরং দেশের প্রযুক্তি শিল্পের ভবিষ্যৎ সম্ভাবনারও একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা হিসেবে দেখা হচ্ছে।
| প্রধান খাত | মূল তথ্য ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা |
| বর্তমান উৎপাদন সক্ষমতা | প্রাথমিক পর্যায়ে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ১,৫০০ ইউনিট স্মার্টফোন অ্যাসেম্বলিং বা সংযোজন করা হচ্ছে। |
| ভবিষ্যৎ লক্ষ্যমাত্রা | আগামী ১ বছরের মধ্যে আরও ৪টি নতুন প্রোডাকশন লাইন স্থাপন করে বার্ষিক উৎপাদন ৫ লক্ষাধিক ইউনিটে উন্নীত করার পরিকল্পনা। |
| পূর্ণাঙ্গ ম্যানুফ্যাকচারিং | আগামী ৬ মাসের মধ্যে শুধু সংযোজন (Assembling) থেকে সম্পূর্ণ উৎপাদন বা পূর্ণাঙ্গ ম্যানুফ্যাকচারিং ব্যবস্থায় যাওয়ার প্রস্তুতি চলছে। |
| ব্যবহৃত আধুনিক প্রযুক্তি | গ্লোবাল স্ট্যান্ডার্ড ও 'জিরো ডিফেক্ট' পলিসি বজায় রাখতে কারখানায় AI (কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা) সমর্থিত অটোমেশন ও উন্নত এআই সেন্সর ব্যবহার করা হচ্ছে। |
| রপ্তানি পরিকল্পনা ও বাজার | দেশের চাহিদা মিটিয়ে প্রথম ধাপে দক্ষিণ এশিয়ার নেপাল, ভুটান ও শ্রীলংকায় এবং পরবর্তীতে মধ্যপ্রাচ্য ও আফ্রিকায় রপ্তানির দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা। |
| বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ ও দাবি |
* রপ্তানি বাড়াতে বর্তমান ৩০% মূল্য সংযোজন (Value Addition) শর্ত কমিয়ে সাময়িকভাবে ৫% এ নামিয়ে আনা। * কাঁচামাল আমদানিতে শুল্ক একদম নামমাত্র করা। * শুধু অ্যাসেম্বলিংয়ে সীমাবদ্ধ না থেকে স্থানীয়ভাবে যন্ত্রাংশ উৎপাদন (Component Making) বাড়ানো। |
| ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা | দীর্ঘমেয়াদী নীতি সহায়তা, শুল্ক সুবিধা ও প্রযুক্তিগত বিনিয়োগ নিশ্চিত করা গেলে বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ ইলেকট্রনিকস ম্যানুফ্যাকচারিং হাবে পরিণত হতে পারে। |