স্মার্টফোন কারখানায় কর্মসংস্থান ও দক্ষতা উন্নয়নের নতুন দিগন্ত
দেশের প্রযুক্তি খাতে বিনিয়োগ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে স্মার্টফোন উৎপাদন শিল্পে নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলছে। আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর একটি হাই-টেক স্মার্টফোন কারখানা শুধু উৎপাদন বাড়ানোর ক্ষেত্রেই নয় বরং কর্মসংস্থান সৃষ্টি, তরুণদের দক্ষতা উন্নয়ন এবং নারীদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার মাধ্যমেও দেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
বিশ্বখ্যাত মোবাইল ফোন কোম্পানি অনারের ব্যবস্থাপনা পরিচালক জহিরুল ইসলাম জানিয়েছেন, বর্তমানে তার কারখানাটিতে দুই হাজার কর্মী বিভিন্ন বিভাগে কাজ করছেন এবং উৎপাদন কার্যক্রম পূর্ণমাত্রায় শুরু হলে কয়েক হাজার মানুষের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে।
তিনি জানান, বর্তমানে উৎপাদন, কোয়ালিটি কন্ট্রোল, প্রযুক্তি ব্যবস্থাপনা, প্যাকেজিং, লজিস্টিকস এবং প্রশাসনিক বিভাগে কর্মীরা দায়িত্ব পালন করছেন। তবে ভবিষ্যতে উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে আরও বিপুলসংখ্যক কর্মী নিয়োগ দেওয়া হবে। বিশেষ করে স্থানীয় তরুণদের অগ্রাধিকার দিয়ে দক্ষ মানবসম্পদ গড়ে তোলার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
অনারের মহাব্যবস্থাপক আব্দুল্লাহ্ আল মামুনের ভাষ্য অনুযায়ী, পূর্ণমাত্রায় উৎপাদন শুরু হলে বার্ষিক উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা ধরা হবে ৫ লক্ষাধিক। এতে শুধু সরাসরি কর্মসংস্থানই নয় বরং পরিবহন, সরবরাহ ব্যবস্থা, যন্ত্রাংশ উৎপাদন, প্যাকেজিং এবং সেবা খাতেও নতুন কাজের সুযোগ তৈরি হবে। ফলে একটি শিল্পকারখানাকে কেন্দ্র করে স্থানীয় অর্থনীতিতে বহুমাত্রিক ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।
নারী কর্মীদের অংশগ্রহণ নিয়েও কারখানা কর্তৃপক্ষ আশাবাদী। তিনি বলেন, আধুনিক স্মার্টফোন উৎপাদন ব্যবস্থায় সূক্ষ্মতা, মনোযোগ এবং প্রযুক্তিগত দক্ষতার প্রয়োজন হয়, যেখানে নারী কর্মীরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। এ কারণে নারী কর্মীদের জন্য নিরাপদ ও সহায়ক কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করার পাশাপাশি তাদের নিয়োগে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
বর্তমানে এ কোম্পানিতে বেশ বড় সংখ্যক নারি কর্মকর্তা বিপণনি ব্যবস্থাপনায় কাজ করছেন বলে তিনি জানান।
কারখানাটিতে নারী কর্মীদের জন্য আলাদা বিশ্রামাগার, স্বাস্থ্যসেবা, নিরাপত্তা ব্যবস্থা এবং মাতৃত্বকালীন সুবিধাসহ বিভিন্ন সহায়ক উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলেও জানা গেছে।
অনারের ব্যবস্থাপনা বিভাগ থেকে জানানো হয়, স্থানীয় কর্মীদের আন্তর্জাতিক মানের কারিগর হিসেবে গড়ে তুলতে ‘নলেজ ট্রান্সফার’ প্রোগ্রাম চালু করা হয়েছে। চীনের অনার ফ্যাক্টরির বিশেষজ্ঞদের তত্ত্বাবধানে কর্মীরা সরাসরি প্রশিক্ষণ পাচ্ছেন এবং স্থানীয় কর্মীদের দক্ষতার উন্নয়ন হচ্ছে বলে তারা জানান।
কারখানা সূত্র জানায়, নতুন কর্মীদের জন্য প্রাথমিক ওরিয়েন্টেশন প্রশিক্ষণের পাশাপাশি আধুনিক যন্ত্রপাতি পরিচালনা, সার্কিট সংযোজন, কোয়ালিটি টেস্টিং, সফটওয়্যার কনফিগারেশন এবং উৎপাদন নিরাপত্তা বিষয়ে হাতে-কলমে প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে।
বিদেশি বিশেষজ্ঞদের তত্ত্বাবধানে পরিচালিত এসব প্রশিক্ষণে আন্তর্জাতিক মানের উৎপাদন পদ্ধতি শেখানো হচ্ছে।
বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতির সাবেক সাধারণ সম্পাদক অর্থনীতিবিদ প্রফেসর ড. আয়নুল ইসলাম বলেন, প্রযুক্তিনির্ভর শিল্পে স্থানীয় জনশক্তিকে দক্ষ করে তোলা গেলে দেশের অর্থনীতিতে দীর্ঘমেয়াদি ইতিবাচক প্রভাব পড়বে। এতে একদিকে যেমন বেকারত্ব কমবে, অন্যদিকে প্রযুক্তি খাতে দক্ষ মানবসম্পদ তৈরি হবে, যা দেশের ডিজিটাল অর্থনীতিকে আরও শক্তিশালী করবে।
তার মতে, স্মার্টফোন কারখানাগুলো যদি উৎপাদনের পাশাপাশি দক্ষতা উন্নয়ন ও অন্তর্ভুক্তিমূলক কর্মসংস্থানে গুরুত্ব দেয়, তাহলে এটি দেশের শিল্পখাতে নতুন যুগের সূচনা করতে পারে। বিশেষ করে নারী ও তরুণদের অংশগ্রহণ বাড়লে প্রযুক্তি খাতে একটি টেকসই ও আধুনিক কর্মসংস্থান কাঠামো গড়ে উঠবে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের শিক্ষক ড. সেলিম রায়হানের মতে, দেশে প্রযুক্তিনির্ভর শিল্পকারখানার বিস্তার ঘটলে বৈদেশিক বিনিয়োগ আকর্ষণও বাড়বে। কারণ দক্ষ মানবসম্পদ ও আধুনিক উৎপাদন অবকাঠামো আন্তর্জাতিক কোম্পানিগুলোর কাছে একটি বড় ইতিবাচক বার্তা বহন করে।
একই সঙ্গে স্থানীয় পর্যায়ে প্রযুক্তি জ্ঞান ছড়িয়ে পড়লে নতুন উদ্যোক্তা তৈরি হওয়ার সম্ভাবনাও বৃদ্ধি পাবে। ফলে স্মার্টফোন উৎপাদন শিল্প শুধু একটি কারখানাকেন্দ্রিক উদ্যোগ নয়, বরং এটি দেশের প্রযুক্তি খাতকে দীর্ঘমেয়াদে শক্তিশালী করার একটি বড় পদক্ষেপ হিসেবেই বিবেচিত হবে বলে তিনি মন্তব্য করেন।