আবাসন খাতে প্রণোদনা নেই, নির্মাণ ব্যয় বৃদ্ধিসহ ধ্বস হওয়ার আশঙ্কা রিহ্যাব নেতৃবৃন্দের
২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে আবাসন খাতের জন্য প্রত্যাশিত কোনো কার্যকর নীতিসহায়তা বা প্রণোদনা না থাকায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছে রিয়েল এস্টেট অ্যান্ড হাউজিং অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (রিহ্যাব)।
সংগঠনটির মতে, নির্মাণসামগ্রীর ওপর নতুন কর ও শুল্ক আরোপের ফলে নির্মাণ ব্যয় আরও বাড়বে, সঙ্গে প্রভাব পড়বে ফ্ল্যাটের দাম ও সাধারণ ক্রেতাদের ওপর। কর্মসংস্থানও কমে যাবে। যারফলে বিশাল ্ধ্বস নেমে আসতে পারে এ খাতটিতে।
প্রস্তাবিত বাজেট নিয়ে প্রাথমিক প্রতিক্রিয়ায় রিহ্যাবের প্রেসিডেন্ট ড. আলী আফজাল বলেন, বাজেটের বিস্তারিত বিশ্লেষণ এখনও চলমান থাকলেও এ পর্যন্ত যেসব বিষয় সামনে এসেছে, তাতে আবাসন খাতের জন্য ইতিবাচক কোনো বার্তা পাওয়া যাচ্ছে না। বিশেষ করে রডের ওপর সুনির্দিষ্ট ভ্যাট আরোপের ফলে নির্মাণ ব্যয় উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পাবে বলে আশঙ্কা করছেন তিনি।
রিহ্যাব দীর্ঘদিন ধরে ফ্ল্যাট ও জমি নিবন্ধন ব্যয় যৌক্তিক পর্যায়ে নামিয়ে আনার দাবি জানিয়ে আসছে। তার মতে, নিবন্ধন ব্যয় কমানো হলে আবাসন খাতে প্রকৃত লেনদেন বাড়বে, বিনিয়োগ উৎসাহিত হবে এবং সরকারের রাজস্ব আয়ও বৃদ্ধি পাবে। তবে এবারের বাজেটে এ বিষয়ে কোনো প্রতিফলন না থাকায় হতাশা প্রকাশ করেছে সংগঠনটি।
ড. আলী আফজাল বলেন, দেশের অর্থনীতির অন্যতম চালিকাশক্তি হলো আবাসন খাত। এই খাতের সঙ্গে প্রায় ২৬৯টি লিংকেজ শিল্প প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে জড়িত। ফলে আবাসন খাতের গতি কমে গেলে শুধু ডেভেলপার বা ক্রেতারাই নয়, রড, সিমেন্ট, সিরামিক, বৈদ্যুতিক পণ্য, আসবাবপত্র ও পরিবহন খাতসহ অসংখ্য শিল্প এবং লাখো মানুষের কর্মসংস্থান ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
তার মতে, নির্মাণ ব্যয় বৃদ্ধি এবং বিনিয়োগ নিরুৎসাহিত হওয়ার কারণে আবাসন খাত আরও সংকুচিত হলে এর নেতিবাচক প্রভাব সামগ্রিক অর্থনীতিতেও পড়বে। এ পরিস্থিতিতে নিবন্ধন ব্যয় হ্রাস, গৃহায়ণবান্ধব করনীতি, দীর্ঘমেয়াদি ও স্বল্পসুদে অর্থায়নের সুযোগ বৃদ্ধি এবং স্থিতিশীল বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্বারোপ করেছে রিহ্যাব।
তবে প্রস্তাবিত বাজেটে অপ্রদর্শিত অর্থ বিনিয়োগের সুযোগ রাখার সিদ্ধান্তকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছে সংগঠনটি।
এ বিষয়ে প্রতিক্রিয়া জানাতে গিয়ে রিহ্যাব প্রেসিডেন্ট বলেন, গত কয়েক সপ্তাহ ধরে তিনি বিভিন্ন গণমাধ্যমে অপ্রদর্শিত অর্থকে উৎপাদনশীল খাতে বিনিয়োগের সুযোগ দেওয়ার দাবি জানিয়ে আসছিলেন। সেই প্রেক্ষাপটে সরকার যে নির্দিষ্ট প্রক্রিয়ার মাধ্যমে অপ্রদর্শিত অর্থ বিনিয়োগের সুযোগ দিয়েছে, তা স্বাগতযোগ্য পদক্ষেপ।
তিনি এ জন্য প্রধানমন্ত্রী, অর্থমন্ত্রী এবং জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) চেয়ারম্যানকে ধন্যবাদ জানান।
ড. আলী আফজাল বলেন, দেশের অর্থনীতিতে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ অপ্রদর্শিত অর্থ দীর্ঘদিন ধরে মূলধারার অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের বাইরে রয়েছে। নির্ধারিত কর পরিশোধের মাধ্যমে সেই অর্থ যদি আবাসনসহ উৎপাদনশীল খাতে বিনিয়োগের সুযোগ পায়, তাহলে তা অর্থনীতির মূল স্রোতে ফিরে আসবে এবং অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে।
তবে রিহ্যাবের সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট আব্দুর রাজ্জাক জানান, আবাসন খাতে নতুন বিনিয়োগ শুধু ফ্ল্যাট বা ভবন নির্মাণেই সীমাবদ্ধ থাকবে না; বরং এর মাধ্যমে রড, সিমেন্ট, সিরামিক, বৈদ্যুতিক পণ্য, আসবাবপত্র ও পরিবহনসহ বিভিন্ন খাতে নতুন অর্থনৈতিক কার্যক্রম সৃষ্টি হবে। একই সঙ্গে কর্মসংস্থান বৃদ্ধি এবং অর্থনীতিতে তারল্য প্রবাহ বাড়াতেও এটি সহায়ক হবে।
তবে অপ্রদর্শিত অর্থ বিনিয়োগের সুযোগকে স্বাগত জানালেও কর ব্যবস্থাকে আরও সহজ, স্বচ্ছ ও বিনিয়োগবান্ধব করার ওপর জোর দিয়েছে রিহ্যাব।
সংগঠনটির এ সিনিয়র নেতার মতে, দীর্ঘমেয়াদে এমন করব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে যাতে মানুষ স্বতঃস্ফূর্তভাবে কর প্রদান করে এবং অপ্রদর্শিত অর্থ সৃষ্টির প্রবণতা কমে আসে।
একই সঙ্গে নির্মাণসামগ্রীর ওপর অতিরিক্ত কর আরোপের বিষয়ে সরকারের পুনর্বিবেচনার আহ্বান জানিয়েছে সংগঠনটি। রিহ্যাবের দাবি, রডসহ নির্মাণসামগ্রীর ওপর নতুন কর শেষ পর্যন্ত ফ্ল্যাট ক্রেতাদের ওপর বাড়তি ব্যয়ের বোঝা চাপাবে এবং আবাসন খাতের প্রবৃদ্ধিকে বাধাগ্রস্ত করবে।
বাজেট-পরবর্তী আলোচনায় আবাসন খাতের দাবিগুলো গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনার আহ্বান জানিয়ে ড. আলী আফজাল বলেন, “আবাসন খাতকে গতিশীল করা মানেই অর্থনীতিকে গতিশীল করা, কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা এবং টেকসই প্রবৃদ্ধির ভিত্তিকে আরও শক্তিশালী করা।”