Favicon

এআই প্রযুক্তিতে অনার কারখানায় স্মার্টফোন উৎপাদন

প্রতিবেদক: মাজহারুল ইসলাম মিচেল মে ২৫, ২০২৬, ৩:৪৮ পূর্বাহ্ণ বিভাগ: এক্সক্লুসিভ
এআই প্রযুক্তিতে অনার কারখানায় স্মার্টফোন উৎপাদন
Photo: Collected
কীভাবে বজায় রাখা হচ্ছে গ্লোবাল স্ট্যান্ডার্ড

বাংলাদেশে স্মার্টফোন উৎপাদন শিল্প দ্রুত সম্প্রসারিত হলেও একটি বড় প্রশ্ন বারবার সামনে আসে স্থানীয় কারখানায় উৎপাদিত ডিভাইসগুলো কি সত্যিই আন্তর্জাতিক মান বজায় রাখতে পারছে? বিশেষ করে যখন বিশ্ববাজারে স্মার্টফোন শিল্প এখন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, অটোমেশন এবং অত্যন্ত কঠোর মান নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার ওপর নির্ভরশীল।
গাজীপুরে অনার স্মার্টফোন উৎপাদন কারখানাকে ঘিরে সাম্প্রতিক সময়ে সেই আলোচনা আরও জোরালো হয়েছে। 
কারখানা কর্তৃপক্ষ দাবি করছে, এখানে এআই-সমর্থিত অটোমেশন ব্যবহার করে গুণগত মান নিশ্চিত করা হচ্ছে এবং চীনের মূল অনার কারখানার গ্লোবাল স্ট্যান্ডার্ড অনুসরণ করা হচ্ছে। তবে বাস্তবে সেই প্রযুক্তি ও মান নিয়ন্ত্রণ কতটা কার্যকর তা জানতে কারখানা সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা, প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ, রপ্তানিকারক এবং শিল্প বিশ্লেষকদের সঙ্গে কথা বলেছে এই প্রতিবেদক।

এআই-সমর্থিত অটোমেশন কীভাবে কাজ করছে

অনারের ব্যবস্থাপনা পরিচালক জানান, স্মার্টফোন উৎপাদনের বিভিন্ন ধাপে এখন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা সম্পন্ন আধুনিক স্বয়ংক্রিয় প্রযুক্তি ব্যবহার করা হচ্ছে। এর মধ্যে রয়েছে ক্যামেরা অ্যালাইনমেন্ট, ডিসপ্লে টেস্টিং, ব্যাটারি পারফরম্যান্স যাচাই, সার্কিট বোর্ড পরীক্ষা এবং ফাইনাল কোয়ালিটি ইনস্পেকশন।
মোবাইল প্রকৌশলী ইঞ্জিনিয়ার সফিকুল ইসলাম বলেন, প্রচলিত ম্যানুয়াল পরীক্ষায় যেখানে মানুষের ভুলের সম্ভাবনা থাকে, সেখানে এআই দ্রুত এবং নির্ভুলভাবে ত্রুটি শনাক্ত করতে পারে।
“আগে একটি ফোনের ডিসপ্লেতে ক্ষুদ্র স্ক্র্যাচ বা পিক্সেল ত্রুটি শনাক্ত করতে মানুষের চোখের ওপর নির্ভর করতে হতো। এখন এআই কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে সেই ত্রুটি শনাক্ত করতে পারছে,” তিনি বলেন।
তিনি আরও জানান, ক্যামেরা মডিউল ইনস্টলেশনের সময় এআই প্রযুক্তি স্বয়ংক্রিয়ভাবে লেন্সের অ্যালাইনমেন্ট পরীক্ষা করে। ফলে ছবি ঝাপসা হওয়া বা ফোকাস সমস্যা অনেকাংশে কমে আসে।
অনারের মহাব্যবস্থাপক আব্দুল্লাহ্ আল মামুন বলেন, উৎপাদন লাইনে ব্যবহৃত কিছু অটোমেশন সফটওয়্যার সরাসরি অনারের আন্তর্জাতিক নেটওয়ার্কের সঙ্গে সংযুক্ত। এর মাধ্যমে প্রতিটি ইউনিটের উৎপাদন তথ্য রিয়েল-টাইমে পর্যবেক্ষণ করা সম্ভব হচ্ছে।

ত্রুটি কমাতে গুণমান নিয়ন্ত্রণ

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আধুনিক স্মার্টফোন কারখানায় এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে পূর্ব গুণমান নিয়ন্ত্রণ, অর্থাৎ কোনো ত্রুটি হওয়ার আগেই ডেটা বিশ্লেষণের মাধ্যমে সম্ভাব্য সমস্যা শনাক্ত করা।
বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব সফটওয়্যার অ্যান্ড ইনফরমেশন সার্ভিসেসের সাবেক সভাপতি ও প্রযুক্তি উদ্যোক্তা সৈয়দ আলমাস কবির বলেন, “এআই এখন শুধু ত্রুটি ধরছে না; এটি মেশিনের আচরণ বিশ্লেষণ করে আগাম সতর্কতাও দিচ্ছে। এতে উৎপাদন বন্ধ হওয়ার ঝুঁকি কমে।”
তার মতে, বাংলাদেশে এই ধরনের প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে স্থানীয় ইলেকট্রনিকস শিল্প ধীরে ধীরে আন্তর্জাতিক উৎপাদন ব্যবস্থার সঙ্গে তাল মেলাতে শুরু করেছে।
সরেজমিনে কারখানায় ঘুরে দেখা যায়, বর্তমানে তাদের দুটি উৎপাদন লেনে মোবাইল তৈরি করা হচ্ছে। কিছু করা হচ্ছে এ্যাসেম্বল আর মেড ইন বাংলাদেশের স্লোগানের মোবাইলের মাদার বোর্ড তৈরি করা হচ্ছে স্বয়ংক্রিয়ভাবে। এছাড়াও মেশিনের তাপমাত্রা, কম্পন বা বিদ্যুৎ ব্যবহারে অস্বাভাবিকতা দেখা হচ্ছে।

চীনের গ্লোবাল স্ট্যান্ডার্ড কীভাবে অনুসরণ করা হচ্ছে

কারখানা কর্তৃপক্ষের দাবি, গাজীপুরের উৎপাদন ইউনিটে চীনের মূল অনার কারখানার একই মান নিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি অনুসরণ করা হচ্ছে।
সংশ্লিষ্টরা জানান, উৎপাদন প্রক্রিয়ার প্রতিটি ধাপ স্ট্যান্ডার্ড অপারেটিং পদ্ধতি অনুযায়ী পরিচালিত হয়। এমনকি যন্ত্রপাতির কনফিগারেশন, কর্মীদের কাজের সময়সূচি এবং মান পরীক্ষার ধরণও আন্তর্জাতিক কারখানাগুলোর সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ রাখা হয়েছে।
একজন বিদেশি প্রযুক্তি পরামর্শক, যিনি কারখানার প্রশিক্ষণ কার্যক্রমের সঙ্গে যুক্ত, বলেন, “একটি স্মার্টফোন উৎপাদনে শতাধিক ক্ষুদ্র ধাপ থাকে। প্রতিটি ধাপের জন্য নির্দিষ্ট সহনশীলতা স্তর নির্ধারণ করা হয়। সেই সীমা অতিক্রম করলেই ইউনিট বাতিল হয়ে যায়।”
তিনি জানান, গাজীপুর কারখানায় ব্যবহৃত মান নিয়ন্ত্রণ সফটওয়্যার এবং পরীক্ষণ পদ্ধতির অনেকগুলোই সরাসরি অনারের গ্লোবাল নেটওয়ার্ক দ্বারা পর্যবেক্ষিত।

আন্তর্জাতিক সার্টিফিকেশন ও মান যাচাই
অনারের জেষ্ঠ্য বিপণন ব্যবস্থাপক ফারুক রহমান জানান, কারখানায় আইএসও-ভিত্তিক গুণমান ব্যবস্থাপনা ব্যব¯ অনুসরণ করা হচ্ছে। পাশাপাশি প্রতিটি ডিভাইস বাজারে ছাড়ার আগে একাধিক পর্যায়ের স্ট্রেস টেস্ট, ব্যাটারি সাইকেল টেস্ট, জিইএস স্থায়িত্ব পরীক্ষা সম্পন্ন করা হয়।
মিরপুর পূরবী শপিং কমপ্লেক্সের রাজিয়া নেটওয়ার্কের স্বত্তাধীকারি মো. ইউনুস হক  বলেন, “আন্তর্জাতিক বাজারে টিকে থাকতে হলে শুধু ব্র্যান্ডের নাম যথেষ্ট নয়। গুণগত মান ধারাবাহিকভাবে বজায় রাখতে হবে।”
তিনি বলেন, “যদি বাংলাদেশে উৎপাদিত স্মার্টফোন আন্তর্জাতিক মান ধরে রাখতে পারে, তাহলে ভবিষ্যতে রপ্তানির বড় সুযোগ তৈরি হবে।”

বাস্তব চ্যালেঞ্জ কোথায়

তবে প্রযুক্তি বিশ্লেষকরা মনে করছেন, কেবল উন্নত যন্ত্রপাতি স্থাপন করলেই আন্তর্জাতিক মান নিশ্চিত করা যায় না। বড় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে দক্ষ মানবসম্পদ তৈরি এবং দীর্ঘমেয়াদে মান নিয়ন্ত্রণ সংস্কৃতি বজায় রাখা।
বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড টেকনোলজির এক শিক্ষিকা সেলিয়া শাহনাজ বলেন, “এআই সিস্টেম যত উন্নতই হোক, সেটি পরিচালনার জন্য উচ্চ দক্ষতাসম্পন্ন প্রকৌশলী প্রয়োজন। স্থানীয়ভাবে সেই দক্ষ জনবল এখনও সীমিত।”
তিনি আরও বলেন, অধিকাংশ গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রাংশ বিদেশ থেকে আমদানি হওয়ায় সাপ্লাই চেইনের ওপর বাংলাদেশের নিয়ন্ত্রণ কম। ফলে আন্তর্জাতিক মান বজায় রাখতে বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থার ওপর নির্ভরতা থেকেই যাচ্ছে।
এছাড়া বিদ্যুৎ সরবরাহ, শিল্প অবকাঠামো এবং উচ্চ প্রযুক্তির যন্ত্রপাতির রক্ষণাবেক্ষণও বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা হচ্ছে।

প্রযুক্তি শিল্পে নতুন বাস্তবতা
বিশ্লেষকদের মতে, বাংলাদেশে স্মার্টফোন উৎপাদনে এআই যুক্ত হওয়া প্রযুক্তি শিল্পের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন। এটি শুধু উৎপাদন বাড়ানোর বিষয় নয়; বরং দেশের শিল্পখাতকে চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের প্রযুক্তির সঙ্গে যুক্ত করার একটি বড় পদক্ষেপ।
তারা বলছেন, যদি স্থানীয় কারখানাগুলো ধারাবাহিকভাবে আন্তর্জাতিক মান বজায় রাখতে পারে, তাহলে বাংলাদেশ ভবিষ্যতে শুধু স্মার্টফোন সংযোজনকারী দেশ নয়, বরং একটি পূর্ণাঙ্গ ইলেকট্রনিকস ম্যানুফ্যাকচারিং হাব হিসেবেও আত্মপ্রকাশ করতে পারে।
গাজীপুরের অনার কারখানাকে তাই শিল্প বিশ্লেষকরা কেবল একটি ব্যবসায়িক প্রকল্প হিসেবে দেখছেন না; বরং এটিকে দেশের প্রযুক্তিনির্ভর শিল্পায়নের একটি পরীক্ষাগার হিসেবেও বিবেচনা করছেন।

এআই প্রযুক্তিতে স্মার্টফোন উৎপাদন: মূল হাইলাইটস

প্রধান ক্ষেত্র মূল তথ্য ও প্রযুক্তিগত হাইলাইটস
এআই-সমর্থিত অটোমেশন ক্যামেরা অ্যালাইনমেন্ট, ডিসপ্লে টেস্টিং, ব্যাটারি পারফরম্যান্স যাচাই, সার্কিট বোর্ড পরীক্ষা এবং ফাইনাল কোয়ালিটি ইনস্পেকশনে এআই ব্যবহার করা হচ্ছে।
নির্ভুল ত্রুটি শনাক্তকরণ প্রচলিত ম্যানুয়াল পদ্ধতির চেয়ে এআই দ্রুত ও নিখুঁতভাবে ডিসপ্লের ক্ষুদ্র স্ক্র্যাচ, পিক্সেল ত্রুটি এবং ক্যামেরা লেন্সের অ্যালাইনমেন্ট সমস্যা শনাক্ত করে।
রিয়েল-টাইম মনিটরিং উৎপাদন লাইনের অটোমেশন সফটওয়্যার সরাসরি অনারের আন্তর্জাতিক নেটওয়ার্কের সাথে যুক্ত, যা প্রতিটি ইউনিটের তথ্য রিয়েল-টাইমে পর্যবেক্ষণ করে।
চীনের গ্লোবাল স্ট্যান্ডার্ড গাজীপুর কারখানায় চীনের মূল অনার কারখানার একই স্ট্যান্ডার্ড অপারেটিং পদ্ধতি (SOP), যন্ত্রপাতির কনফিগারেশন এবং 'জিরো ডিফেক্ট' পলিসি অনুসরণ করা হচ্ছে।
উৎপাদন চিত্র বর্তমানে দুটি উৎপাদন লেনে মোবাইল তৈরি হচ্ছে। এর মধ্যে মাদারবোর্ড তৈরির কাজটি সম্পূর্ণ স্বয়ংক্রিয়ভাবে করা হচ্ছে।
আন্তর্জাতিক সার্টিফিকেশন ও টেস্ট আইএসও (ISO) গুণমান ব্যবস্থা অনুসরণের পাশাপাশি বাজারে ছাড়ার আগে স্ট্রেস টেস্ট, ব্যাটারি সাইকেল টেস্ট এবং স্থায়িত্ব পরীক্ষা সম্পন্ন করা হয়।
বিদ্যমান চ্যালেঞ্জসমূহ

* বুয়েটের শিক্ষিকা সেলিয়া শাহনাজের মতে, এআই পরিচালনার জন্য উচ্চ দক্ষতাসম্পন্ন স্থানীয় প্রকৌশলীর অভাব


* গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রাংশ আমদানির কারণে সাপ্লাই চেইনের ওপর নিয়ন্ত্রণ কম।


* নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ ও উচ্চ প্রযুক্তির যন্ত্রপাতির রক্ষণাবেক্ষণ।

শিল্পের ভবিষ্যৎ কারখানায় এআই যুক্ত হওয়া বাংলাদেশের শিল্পখাতকে চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের (4IR) সাথে যুক্ত করার এবং একটি পূর্ণাঙ্গ ইলেকট্রনিকস ম্যানুফ্যাকচারিং হাব হওয়ার বড় পদক্ষেপ।