বাহাত্তর থেকে পঁচাত্তর সালের সরকারের সাথে জনগণের কোনো সম্পৃক্ততা ছিল না, যে কারণে রাষ্ট্রীয় সহিংসতা করেই ক্ষমতায় টিকে থাকতে হয়েছিল।
জনগণের আকাঙ্ক্ষার বিরুদ্ধে থাকায় ১৯৭৪ সালে বাংলাদেশে দুর্ভিক্ষ নেমে এসেছিল বলে মন্তব্য করেছেন প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রণালয় বিষয়ক উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর। আজ রবিবার রাজধানীর শেরে বাংলা নগরে জুলাই গণঅভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘরের ‘চুয়াত্তরের দুর্ভিক্ষ: স্বাধীনতা-পরবর্তী অর্থনৈতিক সংকট’ শীর্ষক সেমিনারে তিনি এ কথা বলেন।
তিনি বলেন, ‘একটা রাষ্ট্র যেভাবে চালাতে হয়, বাহাত্তর থেকে পঁচাত্তরের সময়ের সরকার তার কোনো বৈশিষ্ট্যকেই রক্ষা করে চলেনি। তারা এমন একটি সরকার গঠন করেছিল, যার সাথে জনগণের ন্যূনতম কোনো সম্পর্ক ছিল না। এ কারণে প্যারামিলিটারি গঠন করা হয়েছিল যেন নাগরিকদের নিষ্পেষণ করা যায়।’
তিনি আরও বলেন, ‘বাহাত্তর সালে বিশ্ববাজারে যেখানে এক মেট্রিক টন চালের দাম ছিল ১৪৭ ডলার, সেখানে বাংলাদেশে এর মূল্য ছিল প্রতি মেট্রিক টন ৩১৬ ডলার। এতেই বোঝা যায়, বাজার নিয়ন্ত্রণ কিংবা জবাবদিহির কোনো উপস্থিতি সেখানে ছিল না। শুধু অর্থনীতি নয়; বরং সরকার চালানোর ক্ষেত্রে প্রায় সব জায়গাতেই তারা ব্যর্থ হয়েছিল। রাষ্ট্র যেভাবে চলে, তার সাথে তৎকালীন শাসকদের কোনো সম্পৃক্ততা ছিল না। তারা জনগণের সার্বভৌমত্বে বিশ্বাস করত না।’
বাহাত্তর থেকে পঁচাত্তর সময়ের ধারাবাহিকতার সঙ্গে শেখ হাসিনা সরকারের তুলনা করে তিনি বলেন, ‘ক্ষমতায় টিকে থাকতে তারা মানুষের ওপর নিষ্পেষণ চালাতে পিছপা হতো না। জনগণের লেজিটিমেসি তাদের ছিল না। যারাই সরকারের বিরোধিতা করত, তাদেরই খুন করা হতো। খেয়াল করলে দেখবেন, শেখ হাসিনার ২০০৯-২০২৪ সালের শাসনামলেও একই কায়দায় বিরোধী মত প্রকাশকারীদের নিষ্পেষণ করা হতো। শেখ হাসিনা সরকার মূলত বাহাত্তর থেকে পঁচাত্তরের শাসনামলেরই একটি এক্সটেনশন ছিল।’
রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর বলেন, ‘ডিসেম্বরে তারা দেশে ফিরে আসতে চায় বলে কেউ কেউ বলে। আসলে এই দেশের মাটি, ঘাস, পানি ও মানুষের সাথে তাদের কোনো সম্পর্ক কখনোই ছিল না। তারা আর কখনো এই দেশে ফিরে আসতে পারবে না।’
জুলাই জাদুঘরে ‘গণতান্ত্রিক অভিযাত্রা সেমিনার সিরিজ’-এর পঞ্চম পর্ব ‘চুয়াত্তরের দুর্ভিক্ষ: স্বাধীনতা-পরবর্তী অর্থনৈতিক সংকট’ শীর্ষক আয়োজনে আলোচক হিসেবে অংশ নেন লেখক ও পানাম ইনস্টিটিউটের ট্রেজারার আসিফ ইকবাল এবং অর্থনীতিবিদ ও গবেষক ড. নাহিয়ান বিন খালেদ।
আসিফ ইকবাল বলেন, ‘স্বাধীনতা-পরবর্তী সময়ে অর্থনৈতিক সংকটের কারণে প্রায় ১৫ লক্ষ মানুষ প্রাণ হারিয়েছিলেন। পৃথিবীর কোনো অর্থনৈতিক সংকটেই এত বিপুল পরিমাণ মানুষের প্রাণ চলে যাওয়ার নজির নেই। তাই এটাকে সংকট না বলে অর্থনৈতিক বিপর্যয় বলা উচিত।’
তিনি বলেন, ‘পঁচাত্তর সালে সরকার পতনের পর জনগণের মাঝে শোকের কোনো প্রতিক্রিয়া ছিল না। কারণ মাত্র কয়েক মাস আগেই ক্ষুধার জ্বালায় মৃত্যুবরণ করার দগদগে স্মৃতি তাদের ছিল। সেই তারাই মাত্র দুই মাসের মাথায় সিপাহিদের সাথে রাস্তায় নেমে বিপ্লব ঘটিয়েছিল। কারণ জনগণ পেছনের রাজনৈতিক ব্যবস্থায় আর ফিরতে চাইছিল না।’
তিনি আরও বলেন, ‘এ বছর জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবসে সরকারপ্রধান রাস্তায় সাধারণ মানুষের র্যালিতে সামনে হেঁটেছেন। এটা জনগণের সাথে সম্পৃক্ত হওয়ার একটি পদ্ধতি। উনি জানেন নাগরিকেরা তাঁর কাছে প্রত্যাশা করে, তাঁর সরকারের কাছে প্রত্যাশা করে, তাঁকে আসলে হাঁটতে হবে। যেটা আমরা চুয়াত্তরের দুর্ভিক্ষে দেখি নাই।’
অর্থনীতিবিদ ড. নাহিয়ান বিন খালেদ বলেন, ‘চুয়াত্তরে দুর্ভিক্ষ হওয়ার বড় একটি কারণ ছিল সুবিধাভোগীদের কাছে খাদ্যের নিরাপত্তা ও সম্পদ কুক্ষিগত করে রাখা। সে সময় যে রেশন কার্ডের ব্যবস্থা ছিল, সেগুলো দেশের একটি নির্দিষ্ট শ্রেণির কাছে চলে গিয়েছিল। এ কারণে গ্রামের কৃষক, শ্রমিক ও সাধারণ নাগরিকেরা এ থেকে বঞ্চিত হয়েছিল।’
তিনি আরও বলেন, ‘সে সময়ের মজুতদারেরা চাল মজুত করে রেখেছিল। কিন্তু মজুতদারদের দৌরাত্ম্য কিংবা বাজারব্যবস্থা নিয়ন্ত্রণ করতে সরকার ব্যর্থ হয়েছিল। চুয়াত্তরের দুর্ভিক্ষ সাধারণ মানুষের মাঝে প্রচণ্ড ক্ষোভেরও সঞ্চার করেছিল।’
অনুষ্ঠানের সভাপ্রধানের বক্তব্যে জুলাই গণঅভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘরের মহাপরিচালক এহ্সান মাহমুদ বলেন, ‘সে সময় বৈশ্বিক কিছু সংকট থাকলেও বাজার নিয়ন্ত্রণের বড় ব্যর্থতা ও রাজনৈতিক অব্যবস্থাপনাই ছিল চুয়াত্তরের দুর্ভিক্ষের মূল কারণ। বাহাত্তর থেকে পঁচাত্তরের শাসনামলের দিকে তাকালে বোঝা যায়, শাসকগোষ্ঠীরা নিজেদের স্বজনপ্রীতি এবং পরিবার তোষণের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানগুলোকে অকার্যকর করে তুলেছিল। চাল ও গম থেকে শুরু করে রিলিফের কম্বল পর্যন্ত কে পাবে, তারা তা নির্ধারণ করে দিত।’
শিল্প-সাহিত্যে চুয়াত্তরের দুর্ভিক্ষের অনুপস্থিতির বিষয়টি উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘রফিক আজাদের লেখা “ভাত দে হারামজাদা নইলে মানচিত্র খাব” কবিতা ছাড়া চুয়াত্তরের দুর্ভিক্ষ নিয়ে সাহিত্যে আপনি খুব বেশি উল্লেখ পাবেন না। দুর্ভিক্ষ নিয়ে কোনো গান, মঞ্চনাটক কিংবা শিল্পকলার অন্য ফর্মের কিছু পাবেন না। এমনকি যতটুকু হয়েছে, তা ইচ্ছে করে আড়ালে রাখা হয়েছে। শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিনের আঁকা দুর্ভিক্ষবিষয়ক আর্টগুলোর খুব বেশি এক্সিবিশনও হতে দেখবেন না। এগুলো হয়তো অভিজাত কোনো ব্যক্তির বাড়িতে শোভা পাচ্ছে কিন্তু তা প্রদর্শিত হওয়া দরকার ছিল সাধারণ মানুষের জন্য।’
‘চুয়াত্তরের দুর্ভিক্ষ: স্বাধীনতা-পরবর্তী অর্থনৈতিক সংকট’ শীর্ষক সেমিনার সঞ্চালনা করেন লেখক ও গবেষক তুহিন খান। সেমিনারে অংশগ্রহণ করেন বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, গবেষক, আইনজীবী, শিক্ষার্থী এবং নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিবৃন্দ।