নৌকা বাইচে জেগে উঠেছে বাংলার হাজার বছরের ঐতিহ্য
শরতের নীল আকাশ আর বর্ষার বিদায়ী ঢলে নদী-নালা যখন কানায় কানায় পূর্ণ, তখন গ্রামবাংলা মেতে ওঠে তার চিরচেনা লোক-উৎসবের এক অদম্য উন্মাদনায়। নদীর বুকে শত বৈঠার এক সুর, এক ছন্দ আর তীরের লাখো মানুষের করতালির সেই চিরন্তন আবহ— ‘নৌকা বাইচ’। যান্ত্রিক সভ্যতার এই যুগেও ঐতিহ্য আর গতির এই মেলবন্ধন ম্লান হয়নি একটুও।
সম্প্রতি সারিগানের চেনা সুর আর পানির বুকে শত বৈঠার ছলাৎ ছলাৎ শব্দে আবারও প্রাণচঞ্চল হয়ে উঠেছে দেশের নদ-নদী। দীর্ঘদিনের খরা কাটিয়ে এ বছর গত ১৮ সেপ্টেম্বর কিশোরগঞ্জের ঘোড়াউত্রা নদী কিংবা ২১ আগস্ট ঢাকার বুড়িগঙ্গা ও ৩২ বছর পর পুরান ঢাকার নবাব বাড়ির ঐতিহ্যবাহী গোল তালাব, ১২ সেপ্টেম্বর ব্রাহ্মণবাড়িয়ার তিতাস ও ১৮ সেপ্টেম্বর ফরিদপুরের কুমার নদ থেকে শুরু করে কুষ্টিয়ার গড়াই নদী- সবখানেই মাঝিদের সারিগানের সুরে আর বৈঠার ছন্দে প্রাণ ফিরে পেয়েছে বাংলার হাজার বছরের ঐতিহ্য ‘নৌকা বাইচ’। আধুনিক বিনোদনের ভিড়েও এই জল-উৎসব ডিজিটাল স্ক্রিনকে টেক্কা দিচ্ছে এবং গ্রামীণ ও নাগরিক সম্প্রীতি আজও ধরে রেখেছে।
নৌকা বাইচ নদীমাতৃক বাংলাদেশের হাজার বছরের লোকসংস্কৃতির এক অনন্য ও অবিচ্ছেদ্য অংশ। নদী এদেশের মানুষের জীবন, জীবিকা আর সংস্কৃতির সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে। আর এই নদীকে কেন্দ্র করেই আবহমান কাল থেকে উদযাপিত হয়ে আসছে জমকালো জল-উৎসব ‘নৌকা বাইচ’। যখন শ্রাবণ-ভাদ্র মাসে নদী-নালা, খাল-বিল আর হাওর-বাঁওড় বর্ষার পানিতে টইটম্বুর থাকে, তখন গ্রামবাংলার বুক চিরে জেগে ওঠে পলিমাটির গন্ধমাখা এই উৎসবের উন্মাদনা।
উৎসের ইতিকথা ও ঐতিহ্য: নৌকা বাইচের ইতিহাস বেশ প্রাচীন। এর উৎপত্তি নিয়ে নানা লোকগাথা প্রচলিত রয়েছে। কেউ বলেন, জগন্নাথ দেবের স্নানযাত্রাকে কেন্দ্র করে এই উৎসবের সূচনা; আবার কারো মতে, মুসলিম নবাব ও জমিদারদের আমলে যুদ্ধের নৌ-মহড়া থেকেই এই বাইচের প্রচলন হয়। তবে এর পেছনের ইতিহাস যাই হোক না কেন, বাংলার সাধারণ মানুষের কাছে এটি কেবল একটি প্রতিযোগিতা নয়, বরং এটি প্রাণের মেলা, সাম্য ও মিলনের মহোৎসব।
নৌকার সাজ ও প্রকারভেদ: নৌকা বাইচের জন্য সাধারণ নৌকা ব্যবহার করা হয় না। এই বিশেষ প্রতিযোগিতার জন্য অত্যন্ত যত্ন ও কুশলতার সাথে তৈরি করা হয় বিশেষ ধরনের নৌকা। এগুলোর মধ্যে ছিপ, কোষা, খেলনা, ময়ূরপঙ্খী, গয়না এবং ঘাসী নৌকা অন্যতম। একেকটি নৌকা লম্বায় ১০০ থেকে ২০০ ফুট পর্যন্ত হতে পারে। কাঠের ওপর খোদাই করা নকশা আর উজ্জ্বল রঙে সাজানো হয় এই তরীগুলোকে। নৌকার সামনের গলুইতে কখনো ময়ূরের মুখ, কখনো বা সিংহের অবয়ব ফুটিয়ে তোলা হয়, যা বাইচকে করে তোলে আরও আকর্ষণীয়।
পানির বুকে গতির ছন্দ ও সারিগান: নৌকা বাইচের মূল আকর্ষণ হলো এর ছন্দ এবং গতি। একেকটি নৌকায় ৫০ থেকে ১০০ জন পর্যন্ত মাল্লা বা মাঝি থাকেন। সবার পরনে থাকে একই রঙের পোশাক, মাথায় বাঁধা থাকে রঙিন গামছা। মাঝিদের এই বিশাল দলকে পরিচালনার জন্য থাকেন একজন ‘নয়া গাঙের কাণ্ডারি’ বা দলনেতা। তিনি নৌকার মাঝখানে বা গলুইতে দাঁড়িয়ে কাঁসর-করতাল বাজিয়ে সুর তোলেন সারিগানের— ‘হেইও রে হেইও, জোয়ান ভাইসালা হেইও...’ এই গানের তালে তাল মিলিয়ে মাঝিরা পানিতে তাদের বৈঠা চালান। তখন শত বৈঠার অবিরাম ছন্দ, আর চারদিকে ছিটকে পড়া রুপালি জলের ফোঁটায় এক নান্দনিক দৃশ্যের অবতারণা হয়।
উন্মাতাল লোক-উৎসব: নৌকা বাইচ যেখানে অনুষ্ঠিত হয়, তার দুই পাড়ে ঢল নামে লাখো মানুষের। জাতি, ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে সব বয়সী মানুষ নদীর তীরে এসে ভিড় জমায়। যারা তীরে জায়গা পান না, তারা ছোট ছোট ডিঙি নৌকা বা ট্রলারে করে নদীর বুকে অবস্থান নেন। ঢাক-ঢোল, কাঁসর আর করতালির শব্দে মুখরিত হয়ে ওঠে পুরো এলাকা। যখন প্রতিযোগী নৌকাগুলো তীরের বেগে ফিনিশিং লাইনের দিকে এগিয়ে যায়, তখন দর্শকদের করতালিতে নদীর জলও যেন নেচে ওঠে ছলাৎ ছলাৎ ছন্দে।
অঞ্চলভেদে বাংলার নৌকা বাইচ: লোকসংস্কৃতির বৈচিত্র্যময় রূপ নদীমাতৃক বাংলাদেশের একেক অঞ্চলের নদী, হাওর আর বিলের প্রকৃতি যেমন ভিন্ন, তেমনি সেসব অঞ্চলে প্রচলিত নৌকা বাইচের ধরন ও নৌকার গঠনেও রয়েছে বৈচিত্র্যের ছোঁয়া। বর্ষার ভরা যৌবনে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ভিন্ন ভিন্ন নামে, ভিন্ন আঙ্গিকে এবং নিজস্ব লোকজ বৈশিষ্ট্যে যে ঐতিহ্যবাহী নৌকা বাইচগুলো অনুষ্ঠিত হয়, তা স্থানীয় সংস্কৃতিকে ধারণ করে এক অনন্য রূপ নেয়।
সিলেটের হাওরাঞ্চল: সিলেট, সুনামগঞ্জ, হবিগঞ্জ ও মৌলভীবাজারের বিস্তীর্ণ হাওরাঞ্চলে নৌকা বাইচ এক তুমুল জনপ্রিয় উৎসব। বিশেষ করে সুনামগঞ্জের টাঙ্গুয়ার হাওর কিংবা হাকালুকি হাওরের বাইচ দেখার মতো। এই অঞ্চলে সাধারণত ‘খেলনা নৌকা’ এবং ‘সারঙ্গী নৌকা’ বেশি ব্যবহৃত হয়। লম্বায় একেকটি নৌকা প্রায় ১০০ থেকে ১৫০ ফুট পর্যন্ত হয়। হাওরের বিশাল জলরাশিতে যখন সারিগানের সুরে শত বৈঠা একসাথে পানিতে পড়ে, তখন এক অভূতপূর্ব দৃশ্যের সৃষ্টি হয়।
পাবনা ও চলনবিল অঞ্চল: উত্তরবঙ্গের পাবনা, সিরাজগঞ্জ ও নাটোর জেলা জুড়ে বিস্তৃত চলনবিল অঞ্চলের নৌকা বাইচের ইতিহাস অত্যন্ত সমৃদ্ধ। এই অঞ্চলে ‘ছিপ নৌকা’ এবং ‘কোষা নৌকা’ সবচেয়ে জনপ্রিয়। ছিপ নৌকাগুলো অত্যন্ত সরু এবং পানির ওপর দিয়ে তীরের বেগে ছুটে চলতে পারে। পাবনার ইছামতী নদী এবং চলনবিলের বুক চিরে যখন এই বাইচ অনুষ্ঠিত হয়, তখন উত্তরবঙ্গের গ্রামীণ জনপদে উৎসবের আমেজ ছড়িয়ে পড়ে।
ব্রাহ্মণবাড়িয়া ও তিতাস নদী: নৌকা বাইচের কথা বললে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার তিতাস নদীর নাম স্বতঃস্ফূর্তভাবেই চলে আসে। গত ১২ সেপ্টেম্বর দীর্ঘ দুই বছর পর তিতাস নদে ঐতিহ্যবাহী নৌকা বাইচ প্রতিযোগিতা আবার রাজকীয়ভাবে ফিরে আসে। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বাইচে ‘ময়ূরপঙ্খী’ ও ‘ছিপ’ নৌকার আধিপত্য বেশি দেখা যায়। নৌকার গলুইতে কাঠের তৈরি ময়ূরের অবয়ব এবং বাহারি রঙের কারুকাজ এই অঞ্চলের বাইচকে দারুণ নান্দনিক করে তোলে।
ফরিদপুর ও কুমার নদ: ফরিদপুরের ভাঙ্গা উপজেলায় কুমার নদের নৌকা বাইচ এই অঞ্চলের এক গৌরবময় লোক-ঐতিহ্য বহন করে আসছে। গত ১৮ সেপ্টেম্বর বিশ্বকর্মা পূজা উপলক্ষে দীর্ঘ বিরতির পর কুমার নদের বুকে এই ঐতিহ্যবাহী নৌকাবাইচ পুনরায় ফিরে আসে। এতে ‘কোষা’ ও ‘বাচারি’ নৌকার দাপট ছিল সবচেয়ে বেশি। কুমার নদের দুই পাড়ে লাখো মানুষের উপস্থিতি এবং গ্রামীণ মেলা পুরো ফরিদপুর অঞ্চলে এক অভূতপূর্ব উৎসবের আমেজ তৈরি করে।
কিশোরগঞ্জ ও ঘোড়াউত্রা নদী: কিশোরগঞ্জের নিকলী উপজেলার ঘোড়াউত্রা নদীর প্রেমঘাট এলাকায় গত ১৮ সেপ্টেম্বর দীর্ঘ ১৭ বছর পর ঐতিহ্যবাহী নৌকা বাইচ উৎসব অনুষ্ঠিত হয়। নিকলী সিটিজেন্স সোসাইটির উদ্যোগে আয়োজিত চার কিলোমিটার দীর্ঘ এই প্রতিযোগিতায় বৃহত্তর সিলেট ও ময়মনসিংহের অন্তত ১২টি বিশালাকার নৌকা অংশ নেয়, যা হাওরবাসীকে মেতে তুলেছিল বাঁধভাঙা উল্লাসে।
ঢাকা ও বুড়িগঙ্গা-শীতলক্ষ্যা: ঢাকার ৪১৬তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে গত ২১ আগস্ট ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের উদ্যোগে বুড়িগঙ্গা নদীতে বর্ণাঢ্য নৌকা বাইচ অনুষ্ঠিত হয়। খোলামোড়া ঘাট থেকে ওয়াইজ ঘাট পর্যন্ত অনুষ্ঠিত এই প্রতিযোগিতার পাশাপাশি আহসান মঞ্জিল সংলগ্ন নবাব বাড়ির ঐতিহাসিক গোল তালাবেও (পুকুর) দীর্ঘ ৩২ বছর পর জল-উৎসব ও প্রতীকী নৌকা বাইচের চমৎকার আয়োজন করা হয়।
মানিকগঞ্জ ও কালীগঙ্গা নদী: মানিকগঞ্জের বেউথা এলাকায় কালীগঙ্গা নদীর বুকে নৌকা বাইচ এই অঞ্চলের শতবর্ষী এক লোক-ঐতিহ্যের স্মারক গত ৩ অক্টোবর ২০২৬ তারিখে এখানে অনুষ্ঠিত হয়েছে এক উৎসবমুখর নৌকাবাইচ প্রতিযোগিতা, যেখানে পাঁচ লক্ষাধিক মানুষের ঢল নামে। এই বাইচে খেল্লা, ঘাসি, ছান্দি ও পানসি ক্যাটাগরিতে দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে আসা ২২টি নৌকা অংশ নেয়।
প্রতিযোগিতায় কুড়িগ্রামের রৌমারী থেকে ব্রহ্মপুত্র নদ হয়ে আসা শালকাঠের তৈরি ‘মায়ের দোয়া’ খেল্লা নৌকাটি প্রথমবার অংশ কেড়েই চ্যাম্পিয়ন হয়ে মোটরসাইকেল জিতে নেয়। এছাড়া ঘাসি নৌকায় সিংগাইরের ‘বাইমাইল এক্সপ্রেস’, ছান্দিতে হরিরামপুরের ‘গায়ান বাড়ি’ এবং পানসি নৌকায় মানিকগঞ্জ সদরের ‘জাগীর জনতা এক্সপ্রেস’ প্রথম স্থান অধিকার করে। এই অঞ্চলের বাইচকে কেন্দ্র করে নদীর দু-পাড়ে বসে বিশাল লোকজ মেলা ও নাগরদোলার আয়োজন।
অঞ্চলভেদে নৌকার নাম কিংবা সারিগানের সুরে ভিন্নতা থাকতে পারে, কিন্তু পানির বুকে গতির লড়াই আর মিলনের যে মূল সুর—তা সব অঞ্চলেই এক। নৌকা বাইচ কেবল একটি অঞ্চলের সীমানায় আবদ্ধ নয়, এটি সমগ্র বাংলাদেশের একতার এবং প্রাণের উৎসব। আঞ্চলিক এই বৈচিত্র্যই মূলত আমাদের লোকসংস্কৃতিকে আরও বেশি সমৃদ্ধ ও রঙিন করে তুলেছে।
বাঙালিয়ানার মেলবন্ধন ও বর্তমান প্রেক্ষাপট: আধুনিকতার ছোঁয়ায় গ্রামবাংলার অনেক ঐতিহ্য হারিয়ে গেলেও নৌকা বাইচের আবেদন এখনো ফুরিয়ে যায়নি। এটি আমাদের সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির এক অনন্য উদাহরণ। এখানে নেই কোনো ভেদাভেদ, সবাই এক হয়ে মেতে ওঠে জয়ের উল্লাসে। সম্প্রতি দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে দীর্ঘ বিরতির পর আবারও তীরের বেগে ছুটেছে ছিপ-কোষা-বাচারি নৌকা। জাতীয়ভাবে এবং বিভিন্ন করপোরেট স্পনসরশিপের মাধ্যমে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বর্ণাঢ্য নৌকা বাইচ প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হচ্ছে, যা আমাদের এই লোকজ ঐতিহ্যকে বাঁচিয়ে রাখতে ভূমিকা রাখছে।
নৌকা বাইচ কেবলই একটি উৎসব নয়, এটি বাঙালির সাহসিকতা, একতা এবং শক্তির প্রতীক। যান্ত্রিক সভ্যতার এই যুগেও নদীর বুকে শত মাঝির এক সুরে বৈঠা চালনার এই দৃশ্য আমাদের মনে করিয়ে দেয় আমরা নদীর সন্তান, আমরা নদীর মতোই গতিশীল ও প্রাণবন্ত। বাঙালির এই নিজস্ব কৃষ্টি ও ঐতিহ্যকে টিকিয়ে রাখতে নদীগুলোকে দূর্ষণমুক্ত রাখা এবং নিয়মিত এমন লোকজ উৎসবের আয়োজন করা আমাদের সকলের দায়িত্ব।