Favicon

রিহ্যাবের নতুন সভাপতি আলী আফজালের ঘোষণা: প্রবাসী বিনিয়োগ, ডাটাবেজ ও স্বচ্ছতার নতুন পরিকল্পনা

প্রতিবেদক: মাজহারুল ইসলাম মিচেল মে ১১, ২০২৬, ৮:৫৩ অপরাহ্ণ বিভাগ: এক্সক্লুসিভ
রিহ্যাবের নতুন সভাপতি আলী আফজালের ঘোষণা: প্রবাসী বিনিয়োগ, ডাটাবেজ ও স্বচ্ছতার নতুন পরিকল্পনা
রিহ্যাব এর নতুন সভাপতি ড. আলী আফজাল।
রিহ্যাবের ইমেজ ফিরিয়ে আনাসহ মেম্বারদের দেয়া হবে নানা সুবিধা

রিয়েল এস্টেট অ্যান্ড হাউজিং অ্যাসোসিয়েশন অফ বাংলাদেশের (রিহ্যাব) এর নতুন সভাপতি ড. আলী আফজাল আবাসন খাতে বড় ধরনের সংস্কারের ঘোষণা দিয়েছেন। 
তার পরিকল্পনায় রয়েছে ডিজিটাল ডাটাবেজ, প্রবাসী বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং উত্তরায় ‘রিহ্যাব স্কয়ার’ নির্মাণ।
তিনি বলেছেন, সংগঠনের কার্যক্রমকে আরও স্বচ্ছ, গতিশীল এবং সদস্যবান্ধব করার লক্ষ্যে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। এসব উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে আবাসন খাতে সদস্যদের কার্যক্রম আরও সহজ, স্বচ্ছ ও গতিশীল হবে। 
নতুন সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পরপরই দি শাটল টাইমসের সঙ্গে আলাপকালে তিনি এসব পরিকল্পনার কথা তুলে ধরেন।


রিহ্যাব সদস্যদের জন্য নতুন সুবিধা
ড. আলী আফজাল বলেন, রিহ্যাবের ইমেজ পুনরুদ্ধার, স্বচ্ছতা বৃদ্ধি এবং সদস্যদের জন্য ব্যবসায়িক সুবিধা বাড়ানো হবে। পাশাপাশি আইনগত সহায়তা, দ্রুত সেবা এবং গণতান্ত্রিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ নিশ্চিত করা হবে।
নতুন এ সভাপতি বলেন, রিয়েল এস্টেট খাত নিয়ে সমাজে নানা ধরনের ভুল ধারণা রয়েছে। বাস্তবে রিহ্যাব সদস্যরা আধুনিক নগর উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছেন।


রিহ্যাবের ইমেজ ফিরিয়ে আনা
নতুন এ সভাপতি অভিযোগ করে বলেন, রিহ্যাবের পূর্ববর্তী কমিটি রিহ্যাবের ইমেজ বেশ তলানিতে ফেলেছিলেন। আর তাই রিহ্যাবের ইমেজ ফিরিয়ে আনতে তার কমিটি সরকারের সঙ্গে ঘন ঘন বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা করবে বলে জানান।
সমাজ উন্নয়নের লক্ষ্যে আবাসন শিল্পকে কিভাবে আরও উন্নত করা যায় এবং বর্তমান সকল সমস্যা কে সমাধানের জন্য বৈঠক ও ডায়লগে যাওয়ার আশা ব্যক্ত করেন তিনি।
ড. আফজাল মনে করেন, যৌক্তিক দাবি ও পরামর্শ দিলে সরকার অবশ্যই রিহ্যাবের কথা শুনবে। সঠিক চিত্র ও এর উত্তরণের উপায় বলতে হবে। আর তাহলেই এগিয়ে আসবেন সাহায্য করতে। তবে প্রয়োজন তাদের সঙ্গে লেগে থাকা।


জবাবদিহিতা ও স্বচ্ছতা বৃদ্ধি
ড. আফজাল বলেন, নতুন কমিটি স্বাধীন ও গণতান্ত্রিকভাবে পরিচালিত হবে। প্রতি মাসে একটি বুলেটিন প্রকাশ করা হবে। এতে পরিচালনা পর্ষদের সব কার্যক্রম থাকবে। নিয়মিত অডিট রিপোর্টও প্রকাশ করা হবে। কাজের গতি বাড়াতে একাধিক কমিটি গঠন করা হবে।


সদস্যদের সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধি
তিনি দাবি করেন, অতীতে সদস্যদের প্রত্যাশা অনুযায়ী সংগঠন পরিচালিত হয়নি। ফলে সদস্যরা আশানুরূপ সেবা পাননি।
ড. আফজাল জানান, রিহ্যাব হবে সম্পূর্ণ গণতান্ত্রিক প্ল্যাটফর্ম। কোনো একক সিদ্ধান্ত থাকবে না। সব সিদ্ধান্ত পরিচালনা পর্ষদের যৌথ আলোচনায় নেওয়া হবে। সদস্যরা পাবেন আইনগত সহায়তা ও ব্যবসায়িক পরামর্শ।


রিহ্যাব স্কয়ার’ চালুর উদ্যোগ
ঢাকার উত্তরায় ১০ তলা ‘রিহ্যাব স্কয়ার’ নির্মাণের কাজ আগামী তিন মাসের মধ্যে শুরু হবে। ইতিমধ্যেই এর সকল প্রস্তুতি নেয়া শেষ বলেও রিহ্যাব প্রশাসনিক শাখা থেকে এ প্রতিবেদককে জানানো হয়।
এখানে থাকবে ফ্যামিলি ক্লাব এবং মেম্বার ক্লাব। বিভিন্ন সভা, সেমিনারসহ যেকোন ধরণে সামাজিক অনুষ্ঠান করার জন্য থাকবে কনভেনশন সেন্টার। সদস্যরা কম মূল্যে এটি ভাড়া নিতে পারবেন।
এছাড়া সদস্যদের জন্য একটি হটলাইন চালু করা হবে, যেখানে ব্যবসায়িক ও ভোক্তা উভয় ধরনের অভিযোগ গ্রহণ করা হবে।


রিহ্যাব বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিকল্পনা
আবাসন খাতের দক্ষ জনশক্তি তৈরির লক্ষ্যে একটি বিশেষায়িত বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। এখানে শুধু রিয়েল এস্টেট ও হাউজিং খাতের শিক্ষা দেওয়া হবে।
যাতে শিক্ষার্থীরা বের হয়েই এ খাতে তাদের মেধাকে কাজে লাগাতে পারে।


নির্মাণ উপকরণের দাম নিয়ন্ত্রণে মনিটরিং টিম
রড ও সিমেন্টসহ নির্মাণ সামগ্রীর দাম নিয়ন্ত্রণে একটি ‘প্রাইস মনিটরিং সেল’ গঠন করা হবে। এটি বাজার মনিটরিংয়ের পাশাপাশি সিন্ডিকেট ভাঙতে কাজ করবে।
এছাড়া নির্মাণ সামগ্রী আমদানিতে শুল্ক কমানোর জন্য তিনি এনবিআরের সাথে দেনদরবার করার পরিকল্পনা করেছেন।
সাধারণ মানুষের জন্য ৫–৭% সুদে দীর্ঘমেয়াদী গৃহঋণ সুবিধা দিতে সরকারের সঙ্গে আলোচনা করা হবে।
বিশেষ করে যারা প্রথমবার ফ্ল্যাট কিনছেন, তাদের জন্য যেন বিশেষ তহবিল গঠন করা হয়, সে লক্ষ্যে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাথে আলোচনার পরিকল্পনা রয়েছে সংগঠনের।  বাংলাদেশের আবাসন খাতের সঙ্গে প্রায় ২৬৯টি শিল্পখাত প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে জড়িত বলে সংশ্লিষ্টরা জানান।
বিশেষজ্ঞদের মতে, নির্মাণসামগ্রীর দাম বৃদ্ধি ও উচ্চ সুদের কারণে সাম্প্রতিক সময়ে আবাসন খাত চাপে রয়েছে।


প্রবাসী বিনিয়োগ আকর্ষণ
দেশের রেমিট্যান্স প্রবাহ বাড়াতে এবং আবাসন খাতে প্রবাসীদের বিনিয়োগ নিশ্চিত করতে বড় পরিসরে ‘রিহ্যাব মেলা’ বা রোড-শো আয়োজনের পরিকল্পনা নেওয়া হচ্ছে। এর মাধ্যমে প্রবাসীরা যেন বৈধ পথে দেশে বিনিয়োগ করে নিরাপদে ফ্ল্যাট বা প্লট কিনতে পারেন, তার নিশ্চয়তা দেওয়া হবে।


ডিজিটাল ডাটাবেজে বাড়বে স্বচ্ছতা
একটি কেন্দ্রীয় ডিজিটাল ডাটাবেজ তৈরি করা হবে। এতে সব প্রকল্পের তথ্য থাকবে। ক্রেতারা সহজে প্রকল্প যাচাই করতে পারবেন। এটি স্বচ্ছতা বাড়াবে এবং প্রতারণা কমাবে।

গবেষণা ও পরিবেশবান্ধব আবাসন

আবাসন খাতে নতুন নতুন প্রযুক্তি এবং টেকসই নির্মাণ সামগ্রী ব্যবহারের গবেষণার জন্য একটি পৃথক ‘রিসার্চ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট’ উইং খোলা হবে। যেখানে কম খরচে কীভাবে ভূমিকম্প সহনশীল এবং পরিবেশবান্ধব বাড়ি তৈরি করা যায়, তা নিয়ে বিশেষজ্ঞরা কাজ করবেন।
ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য পরিবেশ রক্ষা করতে রিহ্যাব এখন পরিবেশবান্ধব বা ‘গ্রিন’ আবাসন প্রকল্পের ওপর জোর দিচ্ছে। ভবন নির্মাণে পরিবেশবান্ধব নির্মাণ সামগ্রীর ব্যবহার এবং আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারে সদস্যদের উৎসাহিত করা হবে।


রাজউকের প্ল্যান পাসে ডিজিটাল ট্র্যাকিং
রাজউকের প্ল্যান পাস প্রক্রিয়া সহজ করতে একটি ডিজিটাল ট্র্যাকিং সিস্টেম চালুর উদ্যোগ নেওয়া হবে, যাতে হয়রানি কমে এবং অনুমোদন দ্রুত হয়।
নতুন ড্যাপ বা বিশদ অঞ্চল পরিকল্পনা এবং রাজউকের প্ল্যান পাসের প্রক্রিয়া সহজ করতে রিহ্যাব লিয়াজোঁ কমিটি আরও শক্তিশালী করা হবে। 
সদস্যদের নকশা অনুমোদন বা অন্যান্য প্রশাসনিক কাজে যেন কোনো ধরণের হয়রানির শিকার হতে না হয় এবং দ্রুততম সময়ে যেন অনুমোদন পাওয়া যায়, তার জন্য একটি ডিজিটাল ট্র্যাকিং সিস্টেম চালুর তাগিদ দেওয়া হবে।


রাজউকের নতুন ড্যাপ সংস্করণ
ড্যাপের কারণে ফ্ল্যাটের সংখ্যা কমে যাওয়ার সমস্যা সমাধানে তিনি রাজউক ও সরকারের উচ্চপর্যায়ের সাথে আলোচনার উদ্যোগ নিয়েছেন। 
তিনি মনে করেন, ঢাকার ওপর চাপ না কমিয়ে বরং পরিকল্পিতভাবে ভবনের উচ্চতা ও আয়তন বাড়ানোর অনুমতি দিলে ফ্ল্যাটের দাম কমবে। 
তিনি দাবি তুলেছেন যাতে ড্যাপকে আরও বাস্তবসম্মত ও বিজ্ঞানভিত্তিকভাবে সংশোধন করা হয়।


গৃহঋণ নীতিমালা
রিহ্যাব সভাপতি ড. আলি আফজাল আবাসন খাতকে চাঙ্গা করে বিলিয়ন ডলারের বাজার বানানোর জন্য গৃহঋণ নীতিমালা আধুনিকায়নের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে বলেন, বর্তমানের উচ্চ সুদহার আবাসন খাতের প্রধান বাধা। 
তিনি সরকারের কাছে দাবি জানিয়েছেন যাতে মধ্যবিত্ত ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত ক্রেতাদের জন্য সর্বোচ্চ ৯ শতাংশ সুদে দীর্ঘমেয়াদী গৃহঋণের ব্যবস্থা করা হয়। এটি কার্যকর হলে সাধারণ মানুষের জন্য ফ্ল্যাট কেনা সহজ হবে এবং বাজারে ফ্ল্যাটের চাহিদা বাড়বে।
বর্তমানে ব্যাংকগুলো একজন ব্যক্তিকে সর্বোচ্চ ২ কোটি টাকা পর্যন্ত গৃহঋণ দিতে পারে। রিহ্যাব সভাপতি এই সীমা বাড়িয়ে ৪ থেকে ৫ কোটি টাকায় উন্নীত করার প্রস্তাব করেছেন। 
তিনি মনে করেন, নির্মাণ সামগ্রীর দাম বাড়ার কারণে ফ্ল্যাটের দামও বেড়েছে, তাই ঋণের সীমা না বাড়ালে ক্রেতারা প্রয়োজনীয় অর্থায়ন পাচ্ছেন না।


উপসংহার
বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশের আবাসন খাত দেশের অর্থনীতির অন্যতম বৃহৎ খাত, যেখানে লাখো কর্মসংস্থান সরাসরি ও পরোক্ষভাবে নির্ভরশীল।
রিহ্যাবের নতুন নেতৃত্বের এই পরিকল্পনাগুলো বাস্তবায়িত হলে আবাসন খাতে একটি আধুনিক, ডিজিটাল ও স্বচ্ছ ব্যবস্থার সূচনা হবে বলে মনে করা হচ্ছে। বিশেষ করে প্রযুক্তি, প্রবাসী বিনিয়োগ এবং নীতিগত সংস্কারের সমন্বয়ে বাংলাদেশের রিয়েল এস্টেট খাত আরও শক্তিশালী অবস্থানে পৌঁছাতে পারে।

এক নজরে প্রধান সংস্কারসমূহ

বিভাগ মূল উদ্যোগ
সদস্য সুবিধা আইনি সহায়তা, ব্যবসায়ী পরামর্শ এবং হটলাইন সেবা।
সাধারণ ক্রেতা ডিজিটাল ডাটাবেজের মাধ্যমে প্রকল্পের স্বচ্ছতা যাচাই।
পরিবেশ কৃষিজমি রক্ষা করে 'উল্লম্ব আবাসন' বা বহুতল ভবনে জোর।
শহর পরিকল্পনা 'তারবিহীন সিটি' গড়তে আন্ডারগ্রাউন্ড ইউটিলিটি টানেল ও ডাক্ট সিস্টেম।