Favicon

ফ্ল্যাটের দাম কেন বাড়ছে না, জানালেন রিহ্যাব সভাপতি

প্রতিবেদক: মাজহারুল ইসলাম মিচেল মে ১১, ২০২৬, ৮:৪০ অপরাহ্ণ বিভাগ: এক্সক্লুসিভ
ফ্ল্যাটের দাম কেন বাড়ছে না, জানালেন রিহ্যাব সভাপতি
রিহ্যাব নতুন সভাপতি ড. আলি আফজাল।
ফ্ল্যাটের দাম কেন বাড়ছে না

নির্মাণ সামগ্রীর দাম ৫-–১০ শতাংশ বৃদ্ধি পেলেও দেশের আবাসন খাতে ফ্ল্যাটের দাম এখনো বাড়েনি বলে জানিয়েছেন রিয়েল এস্টেট অ্যান্ড হাউজিং অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (রিহ্যাব) নতুন সভাপতি ড. আলি আফজাল।

নির্মাণ সামগ্রীর দাম বাড়লেও কেন ফ্ল্যাটের দাম বাড়ছে না, কীভাবে কমবে আবাসন ব্যয় এবং তারবিহীন সিটি গড়ার পরিকল্পনার কথা জানালেন রিহ্যাব সভাপতি।

দি শাটল টাইমস্কে দেয়া এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে তার এ কথাগুলো উঠে আসে।

তিনি জানান, দেশে সিমেন্টের দাম বেড়েছে প্রতি বস্তায় ৫-১০ টাকা আর রডের প্রতি টনে ১৫-২০ হাজার টাকা। আর জমির দাম তো প্রতিনিয়তই বাড়ছে। এরপরও কোন অ্যাপার্টমেন্টের দাম বৃদ্ধি পায়নি। রড-সিমেন্টের দাম বাড়লেও প্রতিযোগিতার বাজারে পুরোনো দামেই বিক্রি হচ্ছে ফ্ল্যাট।

এর কারণ হিসেবে তিনি জানান, বর্তমানে যে সব ফ্ল্যাট বিক্রি হচ্ছে সেগুলো আগেই ক্রেতাদের সঙ্গে চুক্তি হয়েছে। আর যেগুলো এখন আছে খালি সেগুলোও প্রতিযোগিতামূলক রিয়েল এস্টেট বাজারের কারণে আগের দামেই বিক্রি করতে হচ্ছে।

এছাড়াও বড় বড় কোম্পানিগুলো তাদের ব্র্যান্ড ইমেজকে স্বাভাবিক রাখতেও পুরোনো দামেই তাদের পণ্য বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছেন বলে তিনি দাবি করেন।

তবে এ ক্ষেত্রে তিনি সরকারের পলিসি সাপোর্টের দাবি জানিয়ে বলেন, যদি এ মুহুর্তে সরকার নির্মাণ শিল্পের কাচামাল আমদানি করার ক্ষেতে শুল্ক কমিয়ে দেয় তাহলে সকলের জন্যই সুবিধা হয়।

ফ্ল্যাটের দাম কমানোর উপায় কী?

তার মতে, পরিকল্পিত নগরায়ন, ঢাকার বাইরে উন্নয়ন ও বহুতল ভবনের অনুমতি বাড়ালে আবাসন ব্যয় কমানো সম্ভব।

ফ্ল্যাটের দাম কমাতে ঢাকার চাপ কমিয়ে আশেপাশের এলাকাগুলোতে পরিকল্পিত নগরায়ন ও উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। পাশাপাশি বহুতল ভবন নির্মাণে সহজ অনুমতি দিলে জমির ওপর চাপ কমে আবাসন ব্যয় হ্রাস পাবে।

সরকারকে ঢাকার ওপর চাপ কমাতে হবে। এর জন্য সাভার, গাজীপুর, মুন্সিগঞ্জ, নারায়ণগঞ্জ ও টাঙ্গাইলের মতো এলাকা উন্নত করতে হবে।

এর সঙ্গে যোগাযোগ ব্যবস্থা উন্নত করতে হবে। এতে মানুষ প্রতিদিন সহজে ঢাকায় এসে অফিস করে আবার নিজের এলাকায় ফিরে যেতে পারবে।

তাহলেই সাধারণ ক্রেতা তুলনামূলক কম দামে এপার্টমেন্ট পেতে পারেন বলে তিনি মনে করেন।

এছাড়াও, ঢাকার ভিতরে ২০ তলার বহুতল ভবন নির্মাণে অনুমতি দিতে হবে। এর উদাহরণস্বরূপ তিনি মতিঝিলের ব্যাংকপাড়াসহ আশেপাশের সকল এলাকাতে যদি ২০ তলা ভবন তৈরির অনুমতি দেয় শর্ত সাপেক্ষে তাহলেও বেশ কাজে দিবে বলে মনে করেন।

এতে ভবনগুলোতে একসঙ্গে অফিস ও আবাসনের সুবিধা পাওয়া যাবে। ফলে জমির উপরে বেশ চাপ কমে যাবে।

আবাদযোগ্য জমি নষ্ট করা যাবে না

আবাসন খাতের শীর্ষ সংগঠন রিহ্যাব সভাপতির বক্তব্যে আবাদযোগ্য জমি রক্ষার যে আহ্বান উঠে এসেছে, তা বর্তমান বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে অত্যন্ত গুরুত্ববহ।

বাংলাদেশ একটি কৃষিপ্রধান দেশ হওয়া সত্ত্বেও অপরিকল্পিত নগরায়ন ও ঘরবাড়ি নির্মাণের ফলে প্রতিবছর বিপুল পরিমাণ কৃষিজমি অকৃষি খাতে চলে যাচ্ছে। এটি দেশের দীর্ঘমেয়াদী খাদ্য নিরাপত্তার জন্য এক অশনিসংকেত বলে তিনি মনে করেন।

আবাসন খাতের এ সভাপতির মতে, আবাসন সমস্যার সমাধান করতে গিয়ে ঢালাওভাবে কৃষিজমি নষ্ট করা যাবে না। এর পরিবর্তে তিনি ‘উল্লম্ব আবাসন’ (ঠবৎঃরপধষ ঊীঢ়ধহংরড়হ) বা বহুতল ভবন নির্মাণের ওপর বিশেষ জোর দিয়েছেন।

বর্তমানে দেশের শহর ও গ্রামগুলোতে আড়াআড়িভাবে ঘরবাড়ি তৈরির যে প্রবণতা দেখা যায়, তাতে অনেক বেশি জমি অপচয় হয়। কিন্তু পরিকল্পিতভাবে বহুতল ভবন নির্মাণ করলে সীমিত জমিতে অনেক বেশি মানুষের আবাসন নিশ্চিত করা সম্ভব, যা কৃষিজমি রক্ষায় কার্যকর ভূমিকা রাখবে।

এছাড়া, পরিকল্পিত নগরায়নের মাধ্যমে আবাদযোগ্য জমি, জলাশয় এবং বনাঞ্চল সংরক্ষণ করা সম্ভব। সরকারের নীতিমালার সঠিক বাস্তবায়ন এবং আবাসন ব্যবসায়ীদের সচেতনতা এখানে মূল ভূমিকা পালন করতে পারে।

টেকসই উন্নয়নের লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের খাদ্য ও বাসস্থানের নিশ্চয়তা দিতে রিহ্যাব সভাপতির এই দূরদর্শী প্রস্তাবনাটি অত্যন্ত সময়োপযোগী ও বাস্তবায়নযোগ্য একটি দিকনির্দেশনা।

কৃষিজমি রক্ষা করে আধুনিক ও পরিবেশবান্ধব আবাসন গড়া এখন সময়ের দাবি।

তারের জঞ্জালমুক্ত শহর গড়ার পরিকল্পনা

‘তারবিহীন সিটি’ বা তারের জঞ্জালমুক্ত আধুনিক শহর গড়ার ধারণাটি বর্তমানে নগর পরিকল্পনায় অত্যন্ত গুরুত্ব পাচ্ছে। একটি শহরকে দৃশ্যমান তারের জঞ্জাল থেকে মুক্ত করে পরিচ্ছন্ন রূপ দিতে সর্বপ্রথম আন্ডারগ্রাউন্ড ইউটিলিটি টানেল নির্মাণের পরামর্শ দেন তিনি।

এছাড়াও, কমন ডাক্ট সিস্টেম স্থাপন করে তিনি রাস্তা খোঁড়াখুঁড়ি না করার অনুরোধ জানান।

তিনি বলেন, ‘ডাক্ট’ তৈরি হলে বিভিন্ন কোম্পানি তাদের কেবল নিয়ে যেতে পারবে। এটি বাংলাদেশে বর্তমানে অনেক এলাকায় (যেমন ঢাকার কিছু অংশে) বাস্তবায়নের চেষ্টা চলছে।

এ জন্য তিনি নগর কর্তৃপক্ষ বা সিটি করপোরেশনের মাধ্যমে কঠোর আইন প্রয়োগ করে সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানগুলোকে রাস্তার ওপর দিয়ে বা ল্যাম্পপোস্ট ব্যবহার করা থেকে বিরত রাখার তাগিদ দেন।

আমরা যখন বিদেশে যাই সেখানে কখনও রাস্তার পাশ দিয়ে বা ঝুলিয়ে কোন তার নিতে দেখা যায় না। তারা পারলে আমরা কেন পারবো না, প্রশ্নটি করে তিনি অভিযোগ করে বলেন, এ দেশের কিছু অসাধু সরকারি কর্মকর্তা, ব্যবসায়িক সিন্ডিকেট এ ব্যবস্থাপনায় যেতে চাইছেন না। এ ব্যবস্থাপনা সফল করার জন্য তেমন কোন খরচই হবে না সরকারের, শুধু দরকার পলিসি সাপোর্ট আর স্বদিচ্ছা।

তিনি বলেন, আমরা যারা আবাসন শিল্পের সঙ্গে যুক্ত আছি আমরা সবাই ডিস, ইন্টারনেট ও টেলিফোনের কমন সংযোগের ব্যবস্থা করেই বিল্ডিং বানাই। কিন্তু তারপরও ব্যবসায়িরা তাদের ইচ্ছামত তাদের ক্যাবল ঝুলিয়েই নিয়ে থাকেন।

এছাড়াও একটি বিল্ডিং যখন মালিকদের হাতে হস্তান্তর হয়ে যায় তখন আর ওই বিল্ডিংয়ের উপর আবাসন শিল্পের কিছু কর্তৃত্ব না থাকার কারণে তারা আর এর উপরে বিশেষ কোন নজর রাখতে পারে না। তবে বিল্ডিং মালিকরা যদি চান তাহলে সরকারের উপর একটা বিশেষ চাপ আসতে পারে।

এক নজরে মূল দাবি ও প্রস্তাবনা

বিষয় রিহ্যাব সভাপতির প্রস্তাবনা
আবাসন ব্যয় ঢাকার আশেপাশে পরিকল্পিত উপশহর ও উন্নত যাতায়াত ব্যবস্থা।
ভবন উচ্চতা ২০ তলা পর্যন্ত ভবন নির্মাণের সহজ অনুমতি।
কৃষিজমি খাদ্য নিরাপত্তার স্বার্থে আবাদযোগ্য জমি নষ্ট না করে 'ভার্টিক্যাল' উন্নয়ন।
নগর সৌন্দর্য আন্ডারগ্রাউন্ড ক্যাবলিং ও কমন ডাক্ট সিস্টেমের মাধ্যমে তারের জঞ্জাল মুক্তি।
সরকারি সহায়তা অনুদান নয়, বরং শুল্ক কমানো ও আধুনিক জাতীয় নীতিমালার মতো 'পলিসি সাপোর্ট'।