ড্যাপ বাতিল ও কর কমানোর দাবি রিহ্যাব সভাপতির
ঢাকার আবাসন খাত ও রিয়েল এস্টেট বাজারে নতুন প্রকল্প নেওয়া প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে বলে দাবি করেছেন রিয়েল এস্টেট অ্যান্ড হাউজিং অ্যাসোসিয়েশন অফ বাংলাদেশের (রিহ্যাব) নতুন সভাপতি ড. আলি আফজাল।
তার ভাষায়, ড্যাপ নীতি রিয়েল এস্টেট বাজারের বিনিয়োগ স্থবির করে দিয়েছে।
এছাড়াও ফ্ল্যাট ব্যবসায় কর কমানো, ডিজিটাল সেবা ও বিনিয়োগবান্ধব নীতির আহ্বান জানিয়ে রিহ্যাবের নতুন এ অভিভাবক বহুল প্রতিক্ষিত ও দীর্ঘদিনের এ সংগ্রামকে সফল করতে চান।
দেশের আবাসন খাতের ব্যবসায়ীদের একমাত্র এবং শক্তিশালী কেন্দ্রীয় সংগঠন রিহ্যাবের এ নতুন সভাপতি দি শাটল টাইমস্ কে দেয়া এক বিশেষ সাক্ষাতকারে এ আশা ব্যক্ত করেন।
ড্যাপ কী?
ঢাকার ওপর জনসংখ্যার চাপ কমানো এবং পরিকল্পিত ও বাসযোগ্য একটি আধুনিক নগরী গড়ে তোলার লক্ষ্যে ঢাকা এবং এর আশপাশের এলাকাগুলো (রাজউকের আওতাধীন এলাকা) আগামীতে কেমন হবে, কোথায় বাড়ি হবে, কোথায় রাস্তা হবে, কোথায় পার্ক বা জলাশয় থাকবে তার একটি মহাপরিকল্পনা বা গাইডলাইনই হলো ড্যাপ।
রাজধানী ঢাকা এবং এর পার্শ্ববর্তী এলাকার পরিকল্পিত উন্নয়নের প্রধান অভিভাবক ও নিয়ন্ত্রক সংস্থা রাজউক রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক) এর তৎাবধায়ন করে।
ড্যাপের মাধ্যমে নির্ধারণ করে দেওয়া হয় কোন এলাকায় কত তলা পর্যন্ত ভবন নির্মাণ করা যাবে (যাকে বলা হয় ফ্লোর এরিয়া রেশিও)।
তিনি বলেন, ঢাকা মহানগরীর বিশদ অঞ্চল পরিকল্পনা (ড্যাপ) একটা ভৌতিক আইন, যা ২০২২ সালের আগস্টে কার্যকর হয়েছে। এটি বাংলাদেশের আবাসন শিল্পে ব্যাপক নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। ফলে রিয়েল এস্টেট খাতে নতুন প্রকল্পের গতি কমে গেছে।
তিনি বলেন, ড্যাপের কারণে নতুন প্রকল্প গ্রহণ করা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে। বর্তমানে কেউই ১০ তলার উপরে ভবন বানাতে পারছেন না। আবার কোথাও কোথাও ৮ তলায় গিয়ে থেমে যেতে হচ্ছে। যার ফলে ফ্ল্যাট ব্যবসায়িরা বিপুল ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছেন।
রিহ্যাব সংশ্লিষ্টদের দাবি, গত দুই বছরে ঢাকায় নতুন আবাসন প্রকল্প গ্রহণ প্রায় ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ কমে গেছে। একই সময়ে নির্মাণ সামগ্রীর দাম বৃদ্ধির কারণে নির্মাণ ব্যয়ও বেড়েছে প্রায় ৫০ শতাংশ পর্যন্ত।
নির্মাণ ব্যয় বেড়েছে প্রায় দ্বিগুণ। সেই সঙ্গে অনুমোদন জটিলতা। ফলে বিনিয়োগকারীরা অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছেন। নতুন নগর পরিকল্পনায় এই ড্যাপ দ্রুত বাতিলের লক্ষ্যে সরকারের বিভিন্ন মহলের সঙ্গে কথা অব্যাহত রেখেছেন বলে তিনি জানান।
এই মুহূর্তে কী ধরনের নীতিসহায়তা দরকার
আবাসন শিল্পের এ নতুন অভিভাবক সরকারের কাছ থেকে শুধুই পলিসি সাপোর্টই প্রয়োজন উল্লেখ করে বলেন, “আমরা কোন টাকা বা অনুদান চাই না। বরং, আমরাই সরকারকে বিভিন্নভাবে রাজস্ব আয়ে সাহায্য করবো। শুধু চাই আবাসন শিল্প বান্ধন একটি জাতীয় নীতিমালা।”
ড্যাপের বাতিলসহ এ শিল্পের সঙ্গে সংযুক্ত সকল সরকারি অফিসে যেন খুব সহজেই কাজ করতে পারেন সে নিশ্চয়তা চান তিনি। উদাহরণস্বরুপ তিনি অভিযোগ করে বলেন, রাজউক অফিসে তাদের নানাভাবে হয়রানির শিকার হতে হয়। আইনি জটিলতায় পড়তে হয়।
অপরদিকে, ড. আফজাল তাদের উপরে যে কর আরোপ করা হয়েছে তার তিব্র বিরোধিতার সুরে বলেন, এ করের কারণে নতুন বিনিয়োগকারি জন্ম না নিয়ে উল্টো ব্যবসা ছেড়ে দিয়েছেন।
তিনি এ করকে সিঙ্গেল ডিজিটে আনার আহ্বান জানান। এমনকি, যারা আবাসন ও নির্মাণ শিল্পের বিভিন্ন কাঁচামাল তৈরি করছেন তাদেরকে কাঁচামাল আমদানি করার ক্ষেত্রে শুল্ক কমিয়ে দেওয়ারও অনুরোধ জানান।
সরকারের আয় বাড়াবো
আমাদের পরিচালনা পর্ষদ শুধুই আমাদের কথা বলবে না। আমরা সরকারকে পথ দেখাবো কিভাবে এ খাত থেকে প্রচুর রাজস্ব আয় করা সম্ভব। আমরা রাজউকের প্রয়োজনীয় সার্ভিসের জন্য ফি বাড়াতে পরামর্শ দিবো। কিন্তু এর বাইরে আমরা আর কোনও অর্থ প্রদান করবো না বলে নিশ্চয়তা চাইবো।
এছাড়াও রাজউকের পুরো ব্যবস্থাপনাকে ডিজিটাল বা অনলাইন ভিত্তিক করতে বলবো। যাতে আমাদের কাজের অগ্রগতি খুবই দ্রুত হয়।
আমরা সরকারকে জমির রেজিস্ট্রেশন ফি কমাতে বলবো যাতে সবাই জমি ও ফ্ল্যাটের মালিকানা করতে উদ্ভুদ্ধ হয়। এতে রেজিস্ট্রেশনের সংখ্যা বাড়বে ফলে সরকার প্রচুর রাজস্ব পাবে।
অপরদিকে, আমাদের কর্পোরেট কর কমাতে বলবো যাতে নির্মাণ শিল্পের সবাই কর দিতে উৎসাহ পায়। সবাই স্বতঃস্ফূর্তভাবে কর দিলে সরকারের বিশাল আয় হবে।
এরফলে বিনিয়োগ সংকট কেটে গিয়ে বিনিয়োগ বাড়বে। ব্যবসায়িক লেনদেনও বৃদ্ধি পাবে। ফলে দেশের অর্থনৈতিক অবস্থা উন্নত হবে।
তিনি বলেন, ব্যবসাবান্ধব নীতি কার্যকর হলে ফ্ল্যাটের দামও কমে আসবে। এতে ক্রেতাদের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে আবাসন পৌঁছে যাবে। বিক্রি বাড়লে সরকার, বিক্রেতা ও ক্রেতা সব পক্ষই লাভবান হবে।
রিহ্যাব সভাপতির সংস্কার প্রস্তাবনা ও আবাসন খাতের সংকট
| বিষয় | মূল চ্যালেঞ্জ ও সমস্যা | প্রস্তাবিত সমাধান ও দাবি |
| ড্যাপ (DAP) নীতি | ড্যাপ-কে 'ভৌতিক আইন' হিসেবে আখ্যা; ভবন উচ্চতা কমে যাওয়ায় নতুন প্রকল্প ৩০-৪০% হ্রাস পেয়েছে। | ড্যাপ দ্রুত সংশোধন বা বাতিল করে পরিকল্পিতভাবে ভবনের উচ্চতা ও আয়তন বাড়ানোর সুযোগ দেওয়া। |
| ব্যবসায়িক পরিবেশ | রাজউকসহ সরকারি অফিসে হয়রানি এবং অনুমোদন প্রক্রিয়ায় দীর্ঘসূত্রতা। | সম্পূর্ণ ডিজিটাল বা অনলাইন ভিত্তিক ব্যবস্থাপনা এবং স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা। |
| কর ও শুল্ক কাঠামো | উচ্চ কর হারের কারণে বিনিয়োগ স্থবিরতা; কাঁচামাল আমদানিতে চড়া শুল্ক। | কর হার সিঙ্গেল ডিজিটে নামিয়ে আনা এবং নির্মাণ সামগ্রীর আমদানিতে শুল্ক কমানো। |
| রেজিস্ট্রেশন ও রাজস্ব | উচ্চ রেজিস্ট্রেশন ফির কারণে ক্রেতারা নিরুৎসাহিত হচ্ছে। | রেজিস্ট্রেশন ফি কমানো; যাতে মালিকানা পরিবর্তনের সংখ্যা বাড়ে এবং সরকারের রাজস্ব আয় বৃদ্ধি পায়। |
| ঋণ ও বিনিয়োগ | উচ্চ সুদের হার এবং নির্মাণ ব্যয় ৫০% বৃদ্ধি পাওয়ায় বিনিয়োগকারীরা অনিশ্চয়তায়। | দীর্ঘমেয়াদী ও স্বল্প সুদে গৃহঋণের ব্যবস্থা করা এবং কর্পোরেট কর কমানো। |
| জাতীয় নীতিমালা | সুনির্দিষ্ট ও ব্যবসাবান্ধব নীতিমালার অভাব। | সরকারের কাছে কোনো অনুদান নয়, বরং একটি সমন্বিত 'জাতীয় আবাসন নীতিমালা'র দাবি। |
| ভবিষ্যৎ লক্ষ্য | আবাসন খাতের স্থবিরতা ও আকাশচুম্বী ফ্ল্যাট মূল্য। | ব্যবসাবান্ধব নীতিমালার মাধ্যমে ফ্ল্যাটের দাম ক্রেতাদের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে আনা। |